যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হতে ইচ্ছুক বিদেশি শিক্ষার্থীরা ভিসা সাক্ষাৎকারের সময়সূচি সাময়িকভাবে বন্ধ থাকায় চরম অনিশ্চয়তার সম্মুখীন হয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর আগস্ট মাসের শেষ দিকে অভিবাসন ভিসার সাক্ষাৎকারের সময়সূচি প্রদান সাময়িকভাবে স্থগিত করে। নতুন ‘জনকল্যাণ ব্যয়ের বোঝা’ সংক্রান্ত বিধিমালা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে কনস্যুলার কর্মকর্তাদের বিশেষ প্রশিক্ষণের প্রয়োজনে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
তবে এই স্থগিতাদেশ কতদিন স্থায়ী হবে বা কবে নাগাদ পুনরায় ভিসা সাক্ষাৎকার প্রক্রিয়া শুরু হবে, সে বিষয়ে মার্কিন কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে এখনো কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা ঘোষণা করা হয়নি। এই পরিস্থিতির ফলে হাজার হাজার শিক্ষার্থী যারা ইতিমধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির চূড়ান্ত অনুমোদন পেয়েছেন, তারা নির্ধারিত সময়ে ক্লাস শুরু করতে পারছেন না।
অনেক শিক্ষার্থীকে বাধ্য হয়ে তাদের শিক্ষাবর্ষ পিছিয়ে দিতে হতে পারে বলে আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। উচ্চশিক্ষাবিষয়ক বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, ভিসা পাওয়ার এই দীর্ঘসূত্রতা শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত ও আর্থিক পরিকল্পনায় বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে। বিশেষ করে ভারত ও চীনের শিক্ষার্থীরা এই জটিলতায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। ভারতের বেঙ্গালুরুর উচ্চশিক্ষাবিষয়ক বিশেষজ্ঞ বিনীতা পারেখ জানিয়েছেন, অনেক শিক্ষার্থী যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ নিশ্চিত হওয়ার পর তাদের বর্তমান কর্মস্থল থেকে পদত্যাগ করেছেন।
অনেকে উচ্চশিক্ষার জন্য বড় অংকের শিক্ষাঋণ গ্রহণ করেছেন এবং বিদেশে যাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় অন্যান্য প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছেন। কিন্তু ২০২৬ সালের মে মাস থেকে চেষ্টা করেও অনেকে সাক্ষাৎকারের জন্য প্রয়োজনীয় সময়সূচি পাননি। এই অনিশ্চয়তার কারণে অনেক শিক্ষার্থী এখন যুক্তরাষ্ট্রের পরিবর্তে যুক্তরাজ্য, ইউরোপের বিভিন্ন দেশ, দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের মতো বিকল্প গন্তব্যের দিকে ঝুঁকছেন।
বিনীতা পারেখ উল্লেখ করেছেন যে, ভারতীয় শিক্ষার্থীদের কাছে যুক্তরাষ্ট্র এখন আর একমাত্র বা প্রথম পছন্দ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে না। আন্তর্জাতিক সম্পর্কবিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার গোয়ার পরিচালক পুষ্কর জানিয়েছেন, কর্মসংস্থান, উচ্চ বেতন এবং ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ী হওয়ার সুযোগের কারণে দেশটি দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষার্থীদের প্রধান গন্তব্য ছিল।
তবে বর্তমান ভিসা জটিলতা ও কঠোর নিরাপত্তা যাচাইয়ের কারণে সেই পথ ক্রমশ কঠিন হয়ে উঠছে। তিনি আরও বলেন, শিক্ষার্থীরা এখন জার্মানি ও ফ্রান্সের মতো দেশগুলোকে গুরুত্ব দিচ্ছেন, যেখানে নাগরিকত্ব পাওয়ার প্রক্রিয়া তুলনামূলকভাবে স্পষ্ট। তবে শিক্ষা-পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের প্রধান রিচার্ড কাওয়ার্ডের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের শক্তিশালী অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানের সুযোগের কারণে দেশটি আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের কাছে আকর্ষণীয় গন্তব্য হিসেবে টিকে থাকবে।
তার ভাষ্যমতে, শিক্ষার্থীরা তাদের ভবিষ্যৎ কর্মজীবনের সুযোগকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়ে থাকেন। এদিকে চীনা শিক্ষার্থীদের ওপরও এই পরিস্থিতির নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। বিভিন্ন তথ্য অনুযায়ী, ভিসা জটিলতার কারণে অনেক চীনা শিক্ষার্থীকে তাদের ভর্তি আগামী বছর পর্যন্ত পিছিয়ে দিতে বাধ্য হতে হয়েছে। এর ফলে চীনা শিক্ষার্থীদের মধ্যে নিজের দেশের কাছাকাছি অঞ্চলে পড়াশোনার প্রবণতা বাড়ছে।
বিশেষ করে জাপানসহ এশিয়ার বিভিন্ন দেশ তাদের কাছে আগের তুলনায় বেশি আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে। যুক্তরাষ্ট্রের কিছু বিশ্ববিদ্যালয় আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের ক্লাস শুরুর নির্ধারিত সময়ের সাত থেকে ১২ দিন পর পর্যন্ত যোগ দেওয়ার সুযোগ দিলেও, যারা এই সময়ের মধ্যে ভিসা সাক্ষাৎকারের সুযোগ পাবেন না, তাদের ভর্তি পরবর্তী শিক্ষাবর্ষে স্থানান্তর করা ছাড়া কোনো উপায় থাকবে না।
সামগ্রিকভাবে, ভিসা সংক্রান্ত এই প্রশাসনিক জটিলতা আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবনে বড় ধরনের বিঘ্ন সৃষ্টি করেছে এবং তাদের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদী অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।
