ভেনেজুয়েলার সাবেক প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো তার বিরুদ্ধে দায়ের করা ফৌজদারি মামলা বাতিলের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের একটি ফেডারেল আদালতে আনুষ্ঠানিকভাবে আবেদন করেছেন। গত ২ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কের ওই আদালতে মাদুরোর আইনজীবীরা ৬০ পৃষ্ঠার একটি আইনি নথি জমা দেন। এই আবেদনে মাদুরো দাবি করেছেন যে, একজন বিদেশি রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে তিনি ফৌজদারি বিচারের আওতার বাইরে আইনি দায়মুক্তি পাওয়ার অধিকারী।
মাদুরোর পক্ষে এই আবেদনটি করেছেন আইনজীবী ব্যারি পোলাক এবং আনা এস্তেভাও। আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, মাদুরোর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো আন্তর্জাতিক আইন এবং শত শত বছর ধরে চলে আসা রাষ্ট্রপ্রধানদের দায়মুক্তির নীতির পরিপন্থী। গত ৩ জানুয়ারি মধ্যরাতে 'অপারেশন অ্যাবসলিউট রিজলভ' নামক একটি অভিযানের মাধ্যমে ভেনেজুয়েলা থেকে নিকোলাস মাদুরো এবং তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে আসা হয়।
এরপর মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাদের বিরুদ্ধে মাদক-সন্ত্রাসবাদ এবং মাদক পাচারের মতো গুরুতর অভিযোগ আনা হয়। যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে আসার পর থেকেই মাদুরো নিজেকে একজন অপহৃত রাষ্ট্রপ্রধান এবং যুদ্ধবন্দি হিসেবে দাবি করে আসছেন। তিনি শুরু থেকেই তার বিরুদ্ধে আনা এই অভিযোগগুলোকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে অভিহিত করেছেন।
আদালতে জমা দেওয়া নথিতে আইনজীবীরা যুক্তি দিয়েছেন যে, সার্বভৌম রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপ্রধানদের পূর্ণ আইনি দায়মুক্তি আন্তর্জাতিক আইনের একটি মৌলিক ভিত্তি। তাদের মতে, কোনো দেশের সরকারকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেওয়া বা না দেওয়ার ওপর এই দায়মুক্তি নির্ভর করে না। মাদুরো ভেনেজুয়েলার কার্যত রাষ্ট্রপ্রধান বা 'ডি ফ্যাক্টো' নেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন, যা তাকে এই সুরক্ষা পাওয়ার জন্য যথেষ্ট বলে আইনজীবীরা দাবি করেছেন।
এছাড়া মাদুরোর আইনজীবীরা আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ যুক্তি উপস্থাপন করেছেন। তাদের দাবি, অভিযোগপত্রে যে অপরাধগুলোর কথা উল্লেখ করা হয়েছে, সেগুলো মাদুরো তার সরকারি দায়িত্ব পালনকালে এবং রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে তার ক্ষমতা ব্যবহারের মাধ্যমেই করেছেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে। আইনজীবীদের মতে, যদি কোনো কর্মকাণ্ড একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের সরকারি কাজের অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়, তবে যুক্তরাষ্ট্রের আদালতের সেই বিদেশি রাষ্ট্রের সরকারি কর্মকাণ্ডের বিচার করার কোনো আইনি এখতিয়ার নেই।
এই যুক্তির সমর্থনে মাদুরোর আইনজীবীরা গত বছর মার্কিন সুপ্রিম কোর্টের প্রেসিডেন্টের দায়মুক্তি সংক্রান্ত একটি রায়ের নজির টেনেছেন। ওই রায়ে বলা হয়েছিল, কোনো কাজ প্রেসিডেন্টের সরকারি দায়িত্বের অংশ কি না তা নির্ধারণের সময় আদালত সেই কাজের উদ্দেশ্য বা প্রেরণা নিয়ে অনুসন্ধান করতে পারে না। মাদুরোর আইনজীবীদের দাবি, একই আইনি নীতি মাদুরোর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হওয়া উচিত।
অর্থাৎ, আদালতকে প্রথমে এটি নিশ্চিত করতে হবে যে তার কর্মকাণ্ডগুলো সরকারি দায়িত্বের অংশ ছিল কি না। কর্মকাণ্ডগুলো অবৈধ ছিল কি না, তা বিবেচনা করে সেগুলোকে সরকারি কাজের মর্যাদা থেকে বঞ্চিত করা উচিত নয় বলে তারা মনে করেন। অন্যদিকে, মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাদুরোকে ভেনেজুয়েলার অবৈধ নেতা হিসেবে চিহ্নিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
তবে মাদুরোর আইনি দল এটিকে বিচারের আওতায় আনার জন্য একটি রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে দেখছে। তারা মনে করেন, রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে দায়মুক্তি পাওয়ার বিষয়টি কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির ওপর নির্ভর করে না, বরং এটি আন্তর্জাতিক আইনের একটি স্বীকৃত নীতি। বর্তমানে এই আইনি লড়াইয়ের দিকে আন্তর্জাতিক মহলের নজর রয়েছে, কারণ এটি বিদেশি রাষ্ট্রপ্রধানদের বিচারের ক্ষেত্রে একটি বড় নজির স্থাপন করতে পারে।
মাদুরোর আইনজীবীরা আশা করছেন, তাদের উপস্থাপিত যুক্তিগুলো আদালত আমলে নেবে এবং তার বিরুদ্ধে আনা মামলাটি বাতিল করা হবে। তবে মার্কিন বিচার বিভাগ এবং ট্রাম্প প্রশাসন এই দাবির বিপরীতে কী ধরনের আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করে, তা এখন দেখার বিষয়। মাদুরোর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলোর বিচারিক প্রক্রিয়া নিয়ে ভেনেজুয়েলা এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে কূটনৈতিক টানাপোড়েনও অব্যাহত রয়েছে।
এই মামলার পরবর্তী শুনানি এবং আদালতের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে মাদুরোর আইনি ভবিষ্যৎ এবং আন্তর্জাতিক আইনের প্রয়োগের পরিধি।
