ইরানের সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের ফলে মধ্যপ্রাচ্যে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির প্রেক্ষাপটে অঞ্চলটিতে নিজেদের সামরিক উপস্থিতি কমিয়ে আনার পরিকল্পনা করছে যুক্তরাষ্ট্র। সংশ্লিষ্ট কয়েকটি সূত্রের বরাতে এই তথ্য জানা গেছে। গত কয়েক মাসের যুদ্ধে মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলো বড় ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে, যা পেন্টাগনের নীতিনির্ধারকদের নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে।
পেন্টাগনের নীতিবিষয়ক দপ্তর বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক উপস্থিতির বিষয়টি নিবিড়ভাবে মূল্যায়ন করছে। যুদ্ধের সময় ক্ষতিগ্রস্ত ঘাঁটিগুলো পুনর্নির্মাণ করা হবে কি না, সেই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে এই বিশ্লেষণ বড় ভূমিকা রাখবে। জয়েন্ট স্টাফ ও ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ডও বিষয়টি নিয়ে পর্যালোচনা করছে। সাধারণত মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড জর্ডান থেকে ওমান পর্যন্ত প্রায় ১ হাজার ৫০০ মাইল বিস্তৃত অঞ্চলে প্রায় ২০টি স্থাপনায় ৪০ হাজার সেনা মোতায়েন রাখে।
এছাড়া বাহরাইনে মার্কিন পঞ্চম নৌবহরের সদর দপ্তর এবং কুয়েতসহ উপসাগরীয় কয়েকটি দেশে মার্কিন সেনাবাহিনী ও বিমানবাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ রয়েছে। যুদ্ধের আগে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার ঝুঁকির কথা মাথায় রেখে কয়েকটি ঘাঁটি থেকে আগেই সেনা সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। যুদ্ধ চলাকালে কুয়েতের পোর্ট শুয়াইবায় ইরানের হামলায় ছয় মার্কিন সেনা নিহত হন।
এছাড়া দুই শতাধিক মার্কিন স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে। এই পরিস্থিতির মধ্যেই ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার বাঘের গালিবাফ মন্তব্য করেছেন যে, মধ্যপ্রাচ্যে বিদেশি শক্তিগুলোর হস্তক্ষেপ দ্রুত কমছে। ইরাক সফরে থাকা অবস্থায় তিনি দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র এই অঞ্চল থেকে সম্মানজনকভাবে বের হওয়ার পথ খুঁজছে। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ছয় মাস ধরে চলা এই যুদ্ধের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি কবে হবে, তা নিয়ে কোনো স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাচ্ছে না।
গত সোমবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে হওয়া ৬০ দিনের প্রাথমিক সমঝোতা স্মারকের মেয়াদ শেষ হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, ইরানের সঙ্গে বর্তমানে কোনো আলোচনা হচ্ছে না। তবে এর একদিন আগে ট্রাম্পের উপদেষ্টা জ্যারেড কুশনার দাবি করেছিলেন, তেহরানের সঙ্গে আলোচনা চলছে এবং তা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে জোরালো।
ইরানও জানিয়েছে যে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কূটনৈতিক আলোচনায় তাদের আপত্তি নেই। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি দাবি করেছেন, ইরানের শর্তে আলোচনা করতে যুক্তরাষ্ট্র মরিয়া হয়ে পড়েছে। ইরানের সর্বোচ্চ নেতার উপদেষ্টা মোহাম্মদ মোখবের বলেছেন, ইরান আলোচনায় আগ্রহী, তবে তারা আলোচনাকে আত্মসমর্পণের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলছে না। যুদ্ধের প্রভাবে আঞ্চলিক অর্থনীতিতেও বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি হয়েছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাত ইরানের সঙ্গে সব ধরনের বাণিজ্য ও আর্থিক লেনদেন স্থগিত করেছে। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত এই নিষেধাজ্ঞা বলবৎ থাকবে। এছাড়া সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্টের কূটনৈতিক উপদেষ্টা আনোয়ার গারগাশ ইরানকে আর্থিক সুবিধা দেওয়ার খবরকে ভিত্তিহীন বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন। সামগ্রিকভাবে, মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক ও সামরিক প্রেক্ষাপট বর্তমানে এক অনিশ্চিত পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
মার্কিন সামরিক উপস্থিতির এই সম্ভাব্য পরিবর্তন পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তা কাঠামোর ওপর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। পেন্টাগনের চলমান মূল্যায়ন এবং পরবর্তী পদক্ষেপের ওপর নির্ভর করছে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন শক্তির ভারসাম্য কেমন হবে।
