ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের চলমান সামরিক সংঘাত আরও অন্তত ছয় মাস স্থায়ী হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী লিওন পানেটা। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে, কোনো কার্যকর রাজনৈতিক সমাধান না থাকায় এই সংঘাত মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের আরেকটি দীর্ঘস্থায়ী ও ব্যর্থ যুদ্ধে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
পানেটার মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান বর্তমানে এমন এক কঠিন অচলাবস্থায় রয়েছে যেখান থেকে বেরিয়ে আসার মতো সহজ কোনো পথ খোলা নেই। তিনি মনে করেন, ইরাক ও আফগানিস্তানের মতো এই যুদ্ধও দীর্ঘ সময় ধরে চলতে পারে, যা যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতা ও কৌশলগত অবস্থানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
পানেটার এই সতর্কবার্তা এমন এক সময়ে এল যখন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক নেতৃত্বের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠছে। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনী বিভাগের প্রধান ড্যান ড্রিসকল পদত্যাগ করেছেন। পানেটা উল্লেখ করেন যে, প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের সঙ্গে কয়েকজন কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করা নিয়ে ড্রিসকলের মতবিরোধ ছিল, যা পেন্টাগনের ভেতরে অস্থিরতার ইঙ্গিত দেয়।
২০১১ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত প্রতিরক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করা পানেটা মনে করেন, এই অস্থিরতা মার্কিন সামরিক কাঠামোয় নেতৃত্বের অভাবকে স্পষ্ট করছে। তার ভাষ্যমতে, ইরানসহ যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিপক্ষ দেশগুলো ওয়াশিংটনের এই দুর্বলতা পর্যবেক্ষণ করছে, যা বৈশ্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির জন্য উদ্বেগজনক। পানেটা আরও বলেন, চীন, রাশিয়া ও উত্তর কোরিয়ার মতো দেশগুলো নিজেদের মধ্যে সহযোগিতা বৃদ্ধি করছে এবং তারা যুক্তরাষ্ট্রকে আগের চেয়ে দুর্বল হিসেবে দেখছে।
তবে পেন্টাগন এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে। পেন্টাগনের প্রধান মুখপাত্র শন পারনেল এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের নেতৃত্বে প্রতিরক্ষা দপ্তর পুরোপুরি সক্রিয় রয়েছে এবং দপ্তরে কোনো বিশৃঙ্খলা নেই। ইরান যুদ্ধ মোকাবিলায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সামনে তিনটি পথ খোলা রয়েছে বলে পানেটা উল্লেখ করেন। প্রথমত, তিনি যুদ্ধ থেকে সরে এসে এটিকে ব্যর্থ হিসেবে স্বীকার করতে পারেন, যা রাজনৈতিকভাবে কঠিন।
দ্বিতীয়ত, বর্তমান অচলাবস্থা দীর্ঘায়িত হতে পারে, যেখানে উভয় পক্ষ সময় সময় একে অপরের ওপর হামলা চালাবে কিন্তু বড় যুদ্ধ এড়ানোর চেষ্টা করবে। তৃতীয়ত, তিনি হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার কৌশল গ্রহণ করতে পারেন। পানেটার মতে, হরমুজ প্রণালি বন্ধ বা বিঘ্নিত করার ক্ষমতা ইরানের সবচেয়ে বড় কৌশলগত সুবিধাগুলোর একটি।
তাই যুক্তরাষ্ট্র যদি এই প্রণালির ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারে, তবে ইরানের চাপ প্রয়োগের ক্ষমতা অনেকাংশে কমে যাবে। যুদ্ধ জয়ের শর্ত হিসেবে তিনি মার্কিন নীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের ওপর জোর দিয়েছেন। পানেটা অভিযোগ করেন যে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বারবার যুদ্ধ শেষ হওয়ার চুক্তি খুব কাছাকাছি বলে দাবি করলেও তার বাস্তব প্রতিফলন নেই, যা তার বিশ্বাসযোগ্যতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
যুদ্ধের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তার কথা উল্লেখ করে যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স জানিয়েছেন, তিনি এই সংঘাতকে সরাসরি যুদ্ধ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করতে চান না এবং আগামী নভেম্বরের নির্বাচনের আগে এটি শেষ হবে কি না, তা তার জানা নেই। পানেটা আরও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন মার্কিন সেনাদের দীর্ঘ সময় যুদ্ধাঞ্চলে মোতায়েন রাখা নিয়ে।
তিনি উদাহরণ হিসেবে যুদ্ধজাহাজ আব্রাহাম লিংকনের কথা উল্লেখ করেন, যা ২৬০ দিনের বেশি সময় ধরে ইরানবিরোধী অভিযানে অংশ নেওয়ার পর সম্প্রতি থাইল্যান্ডে পৌঁছেছে। দীর্ঘ সময় বন্দরে না যাওয়া এবং যুদ্ধজাহাজে জীবনযাত্রার পরিস্থিতির অবনতি সেনাদের ওপর মানসিক ও শারীরিক চাপ সৃষ্টি করছে। পানেটা মনে করেন, সামরিক সদস্যদের যথাযথ সহায়তা নিশ্চিত করা এখন জরুরি হয়ে পড়েছে।
সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনায়, লিওন পানেটা মনে করেন যে, দ্রুত কোনো রাজনৈতিক সমাধান না এলে এই সংঘাত দীর্ঘায়িত হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। মার্কিন জনমত জরিপগুলোতেও দেখা যাচ্ছে যে, অনেক নাগরিক ইরানের সঙ্গে এই সংঘাতকে ভুল সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখছেন এবং যুদ্ধের বিরোধিতা করছেন। ফলে, চলমান এই পরিস্থিতি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
