মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিতে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ নিয়ে জাতীয় নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্বার্থ ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান অস্থিরতা এবং ইরান সংকটকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই নিরাপত্তা কাঠামোতে যোগ দেওয়া বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের নিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতির পরিপন্থী হতে পারে। মক্কা চুক্তির প্রেক্ষাপট মূলত মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ও ইসরায়েলি কার্যক্রমের ফলে সৃষ্ট নিরাপত্তাশূন্যতা পূরণের প্রচেষ্টার ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়েছে।
ইরান বিপ্লবের পর থেকে এই অঞ্চলে ইরানকে চাপে রাখতে সৌদি আরব, কাতার, কুয়েত, জর্ডান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতকে নিয়ে একটি কৌশলগত বলয় তৈরির চেষ্টা চলছে। সাম্প্রতিক সময়ে মার্কিন ঘাঁটিতে হামলার ঘটনা এবং প্রচলিত নিরাপত্তা ব্যবস্থার অনিশ্চয়তা মিত্র দেশগুলোকে নতুন বিকল্পের দিকে ধাবিত করেছে। তবে এই চুক্তি এখনো একটি পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থা নয়, বরং এটি একটি আংশিক নিরাপত্তা কাঠামো হিসেবে কাজ করছে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই চুক্তিতে যোগদানের আগ্রহের পেছনে ধর্মীয় আবেগ এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার সমীকরণ কাজ করছে। অনেকে মনে করছেন, এমন একটি জোটে অংশ নিলে দেশের অভ্যন্তরীণ সংহতি বৃদ্ধি পাবে এবং ভারতের সঙ্গে বিদ্যমান কূটনৈতিক টানাপোড়েনের প্রেক্ষাপটে নিরাপত্তা ঝুঁকি মোকাবিলা সহজ হবে। তবে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর থেকে কোনো সামরিক জোটে অংশগ্রহণ না করার যে দীর্ঘস্থায়ী নীতি রয়েছে, তা এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে আমূল পরিবর্তিত হতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান সরকারের ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নীতির মূল ভিত্তি হলো কোনো বিশেষ শক্তির দিকে ঝুঁকে না পড়ে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা। এই নতুন সামরিক জোটে যোগদান করলে সরকারের এই নিরপেক্ষ অবস্থান প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে। চুক্তিতে যোগদানের সম্ভাব্য সুবিধার চেয়ে ঝুঁকির দিকটিই বেশি প্রবল বলে মনে করা হচ্ছে।
প্রথমত, বাংলাদেশ ঐতিহাসিকভাবে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত থেকে নিজেকে দূরে রেখেছে। এই জোটে যুক্ত হলে বাংলাদেশ সরাসরি ওই অঞ্চলের সংঘাতের অংশ হয়ে পড়ার ঝুঁকিতে পড়বে। দ্বিতীয়ত, এই জোটকে যদি সুন্নি জোট হিসেবে দেখা হয়, তবে অন্য ধারার দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। তৃতীয়ত, বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তৈরি পোশাক রপ্তানির প্রধান পথ লোহিত সাগরের বাব আল-মান্দেব প্রণালি বর্তমানে হুতিদের প্রভাবাধীন। এই জোটে সরাসরি যোগ দিলে বাংলাদেশ হুতিদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতে পারে। বর্তমানে তুরস্ক, সৌদি আরব ও পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় সামরিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক অত্যন্ত সফল। এই সুবিধাগুলো কোনো জোটে যোগ না দিয়েই বজায় রাখা সম্ভব।
ভারতের পক্ষ থেকে এই চুক্তির বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হলেও, বাংলাদেশের সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নিজস্ব জাতীয় স্বার্থের নিরিখে। চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো পরাশক্তিগুলোও সম্ভবত বাংলাদেশের বর্তমান ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতির ধারাবাহিকতা বজায় রাখাকেই সমর্থন করবে, কারণ বাংলাদেশে স্থিতিশীলতা বজায় থাকা উভয় দেশের বাণিজ্যিক স্বার্থের জন্য জরুরি। এ ধরনের বড় জাতীয় সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে জাতীয় সংসদে আলোচনার প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য।
সংসদের বাইরে নাগরিক সমাজ, গণমাধ্যম, বিভিন্ন গবেষণাপ্রতিষ্ঠান এবং অভিজ্ঞ কূটনীতিকদের সঙ্গে বিস্তারিত আলাপ-আলোচনা করা প্রয়োজন। এটি কেবল সরকারের অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত না হয়ে একটি উন্মুক্ত ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সব অংশীজনের মতামত নিয়ে সম্পন্ন হওয়া জরুরি। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে দীর্ঘদিনের জাতীয় ঐকমত্য এবং বর্তমান সরকারের পররাষ্ট্রনীতির সঙ্গে এর সামঞ্জস্য গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
