ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে সরকারি স্কুল শিক্ষার্থীদের মধ্যে শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়নের দাবিতে বিক্ষোভের ঢেউয়ে পরিণত হয়েছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্তের শিক্ষার্থীরা স্কুল ভবনের জরাজীর্ণ অবস্থা, শিক্ষক সংকট, বিশুদ্ধ পানির অভাব, এবং বিদ্যুৎ ও অন্যান্য মৌলিক সুবিধার দাবিতে মাঠে নেমেছে।
সম্প্রতি উত্তর প্রদেশের সামুহি ভাটপুরওয়া গ্রামের একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ১২২ জন শিক্ষার্থী ক্লাস বর্জন করে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে। লাল-সাদা স্কুল ইউনিফর্ম পরা এই শিক্ষার্থীদের মধ্যে অনেকের বয়স মাত্র ছয় বছর। নতুন স্কুল ভবন নির্মাণের আশ্বাস না পাওয়া পর্যন্ত তারা শ্রেণিকক্ষে যেতে অস্বীকৃতি জানায়। বিক্ষোভের সময় কয়েকজন শিক্ষার্থীর হাতে ভারতের জাতীয় পতাকা ছিল।
বিদ্যালয়টির বর্তমান ভবনটি দীর্ঘদিন ধরে জরাজীর্ণ অবস্থায় রয়েছে। ২০২৩ সালে একটি দেয়াল ধসে এক ছাত্রী গুরুতর আহত হওয়ার পর ভবনের একটি অংশ এখনও ক্ষতিগ্রস্ত অবস্থায় পড়ে আছে। নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে শিক্ষার্থীরা দীর্ঘদিন ধরে নতুন ভবনের দাবি জানিয়ে আসছিল। তবে তাদের দাবি গুরুত্ব না পাওয়ায় গত ২২ আগস্ট তারা বিক্ষোভে নামে।
বিষয়টি জানাজানি হলে শিক্ষা বিভাগের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা স্কুলটি পরিদর্শনে যান। ব্লক শিক্ষা কর্মকর্তা দীপক অবস্থি শিক্ষার্থীদের দ্রুত নতুন ভবন নির্মাণ করার আশ্বাস প্রদান করেন। এই আশ্বাসের পর শিক্ষার্থীরা তাদের বিক্ষোভ শেষ করে বাড়ি ফিরে যায়।
আট বছর বয়সী এক শিক্ষার্থী জানায়, জরাজীর্ণ ভবনটি নিয়ে তারা সবসময় আতঙ্কে থাকে। ভবনটি যেকোনো সময় ধসে পড়তে পারে—এই ভয় তাদের পড়াশোনাতেও মনোযোগ দিতে বাধা দেয়। তবে নতুন ভবনের আশ্বাস পেয়ে সে খুশি হয়েছে বলে জানায়।
শুধু উত্তর প্রদেশ নয়, গত জুলাইয়ের শেষ দিক থেকে ভারতের অন্তত ১০টি রাজ্যে সরকারি স্কুল শিক্ষার্থীদের একই ধরনের বিক্ষোভের খবর পাওয়া গেছে। মহারাষ্ট্র, বিহার, রাজস্থান, ঝাড়খণ্ড ও মধ্যপ্রদেশসহ বিভিন্ন রাজ্যের শিক্ষার্থীরা স্কুলের অবকাঠামোগত সংকটের বিরুদ্ধে আন্দোলন করছে।
বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সরকারি স্কুলগুলোর জরাজীর্ণ ভবন, শিক্ষক ভবন, বেঞ্চের অভাব, বিশুদ্ধ পানির সমস্যা, বিদ্যুৎ না থাকা এবং শৌচাগারের অপ্রতুলতার মতো বিষয়গুলো নিয়ে শিক্ষার্থীরা ক্ষোভ প্রকাশ করছে। গত ২৮ জুলাই উত্তর প্রদেশের সার্বোদয় ইন্টার কলেজের শিক্ষার্থীরা একই ধরনের বিক্ষোভ করে। তাদের অভিযোগ ছিল, স্কুলে পর্যাপ্ত পানীয় জল নেই, বিদ্যুতের ব্যবস্থা নেই এবং শিক্ষার্থীদের বসার জন্য পর্যাপ্ত বেঞ্চও নেই।
ফলে অনেক শিক্ষার্থীকে মেঝেতে বসে ক্লাস করতে হয়।
একইভাবে গত ৩১ জুলাই মহারাষ্ট্রের পারলি এলাকায় বৈদ্যনাথ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা শিক্ষক সংকটের প্রতিবাদে বিক্ষোভ করে। এর আগে জুন মাসের শুরুতে পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস, শিক্ষা ব্যবস্থার নানা অনিয়ম এবং বেকারত্বের বিরুদ্ধে ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে জেন জেড তরুণদের বড় ধরনের আন্দোলন দেখা যায়। সেই আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় এখন স্কুলশিক্ষার্থীদের এই বিক্ষোভকে অনেকে ‘জেন আলফা আন্দোলন’ হিসেবে বলে থাকেন।
ভারতের শিক্ষা অধিকার আন্দোলনকর্মীদের মতে, সরকারি স্কুলগুলোর শিক্ষার্থীরা এখন নিজেদের মৌলিক অধিকার সম্পর্কে সচেতন হচ্ছে। তারা শিক্ষক, নিরাপদ স্কুল ভবন, বিশুদ্ধ পানি, বিদ্যুৎ ও শৌচাগারের মতো প্রয়োজনীয় সুবিধা দাবি করছে।
ভারতের ২০০৯ সালের শিক্ষা অধিকার আইনে ছয় থেকে ১৪ বছর বয়সী শিশুদের শিক্ষাকে মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। আইন অনুযায়ী, স্কুলে নিরাপদ ভবন, পানি, স্যানিটেশন ও শিশুদের নিরাপত্তার ব্যবস্থা থাকার কথা। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর অনুপাতও নির্দিষ্ট মানদণ্ড অনুযায়ী নির্দিষ্ট রাখা কথা।
তবে সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ভারতে এখনো এক লাখের বেশি স্কুল রয়েছে যেখানে সব শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য মাত্র একজন শিক্ষক রয়েছেন। এসব স্কুলে প্রায় ২৯ লাখ শিশু পড়াশোনা করছে।
স্কুলের খাবারের মান নিয়েও বিভিন্ন এলাকায় শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের ঘটনা ঘটেছে। বিহারের সিমুয়াড়া গ্রামে প্রায় ৫০ জন শিক্ষার্থী নিম্নমানের মধ্যাহ্নভোজের প্রতিবাদে চার কিলোমিটার পথ হেঁটে এক সরকারি কর্মকর্তার কাছে অভিযোগ জানায়।
শিক্ষাবিদদের দিক থেকে বলা হয়েছে যে, ভারতের স্কুলব্যবস্থার উন্নয়নে বিচ্ছিন্ন কিছু পদক্ষেপ নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি ও কার্যকর সংস্কার প্রয়োজন। দেশের সব এলাকায় সমান মানের শিক্ষা অবকাঠামো গড়ে তোলা, পর্যাপ্ত ও দক্ষ শিক্ষক নিয়োগ এবং শিশুদের নিয়মিত স্কুলে ক্লাসে পাঠাতে পরিবারগুলোকে যেগুলো উৎসাহিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমানের এই স্কুলভিত্তিক আন্দোলন ভবিষ্যতে ভারতের রাজনীতিতে প্রভাব ফেলতে পারে। দেশটির মোট জনসংখ্যার ৩০ শতাংশের বেশি মানুষের বয়স ১৮ বছরের নিচে। আজ যারা স্কুলের অবকাঠামো ও শিক্ষার মান নিয়ে আন্দোলন করছে, তাদের অনেকেই ২০২৯ সালের জাতীয় নির্বাচনের সময় ভোটার হবে।
শিক্ষা আন্দোলনকারীরা বলছেন, শিক্ষার্থীদের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা না গেলে তা ভারতের ভবিষ্যৎ উন্নয়নের পথেও বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। তাদের মতে, শিক্ষার্থীদের শিক্ষার্থীদের দাবি ও অভিযোগ গুরুত্ব দিয়ে শোনা না হলে ভবিষ্যতে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে আরও বড় ধরনের শিক্ষা সংস্কার আন্দোলন দেখা যেতে পারে।
