বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার সার্ব-অধ্যুষিত স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল রিপাবলিকা সার্পস্কায় ইসরায়েলি চেম্বার অব কমার্সের একটি নতুন কার্যালয় আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হয়েছে। এই উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ইসরায়েলের প্রবাসীবিষয়ক মন্ত্রী আমিচাই চিকলি এবং রিপাবলিকা সার্পস্কার নেতা মিলোরাদ দোদিক উপস্থিত ছিলেন। বলকান অঞ্চলে নিজেদের প্রভাব বিস্তারের অংশ হিসেবে ইসরায়েল এই উদ্যোগ গ্রহণ করেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
অনুষ্ঠানে ইসরায়েলি মন্ত্রী আমিচাই চিকলি বলেন, এই চেম্বারটি রিপাবলিকা সার্পস্কা এবং বৃহত্তর অঞ্চলে সুযোগ খুঁজতে থাকা ইসরায়েলি কোম্পানিগুলোর জন্য একটি স্থায়ী যোগাযোগকেন্দ্র হিসেবে কাজ করবে। তিনি রিপাবলিকা সার্পস্কার নেতৃত্বের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেন, তারা ইসরায়েল ও ইহুদি জনগণের প্রকৃত বন্ধু। এই সম্পর্ককে এখন বাস্তব কর্মকাণ্ডে রূপ দেওয়ার সময় এসেছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
রিপাবলিকা সার্পস্কার নেতা মিলোরাদ দোদিক বিগত বছরগুলোতে ইসরায়েলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। তিনি অতীতে বিভিন্ন সময় ইসরায়েলের প্রতি তার সমর্থন ব্যক্ত করেছেন এবং ফিলিস্তিনিদের বিষয়ে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে তিনি রিপাবলিকা সার্পস্কাকে ‘বলকানের ইসরায়েল’ হিসেবে অভিহিত করেছিলেন, যা এই অঞ্চলের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বেশ আলোচনার জন্ম দেয়।
বিশ্লেষকদের মতে, এই কার্যালয় উদ্বোধনের মাধ্যমে বলকান অঞ্চলে ইসরায়েলের কৌশলগত উপস্থিতি আরও শক্তিশালী হবে। লন্ডন কিংস কলেজের অধ্যাপক ভুক ভুকসানোভিচের মতে, এই উদ্যোগ থেকে তাৎক্ষণিক বড় ধরনের অর্থনৈতিক সুবিধা পাওয়ার সম্ভাবনা কম থাকলেও এটি গত ১৫ বছর ধরে গড়ে ওঠা ইসরায়েল ও রিপাবলিকা সার্পস্কার ঘনিষ্ঠ সম্পর্কেরই প্রতিফলন।
গত তিন বছরে এই সম্পর্ক আরও জোরদার হয়েছে। গাজায় চলমান যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইসরায়েল বর্তমানে কিছুটা বিচ্ছিন্ন অবস্থায় রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যের বাইরের দেশগুলোর সঙ্গে নতুন কূটনৈতিক ও নিরাপত্তা সম্পর্ক গড়ে তোলা ইসরায়েলের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বলকান অঞ্চলটি ভৌগোলিকভাবে মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার নিকটবর্তী হওয়ায় ইসরায়েলের কাছে এর বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে।
তুরস্ক এবং ইরানের মতো দেশগুলোর প্রভাব মোকাবিলায় বলকানে নিজেদের উপস্থিতি বজায় রাখা ইসরায়েলের কৌশলগত পরিকল্পনার অংশ হতে পারে। এছাড়া পূর্ব ইউরোপে নিজেদের প্রভাব ধরে রাখার মাধ্যমে ফিলিস্তিন ইস্যুতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের কূটনৈতিক অবস্থানে বড় ধরনের পরিবর্তন ঠেকানোর চেষ্টাও ইসরায়েলের থাকতে পারে। রিপাবলিকা সার্পস্কা বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার একটি অংশ হলেও এটি প্রায়ই বিচ্ছিন্নতাবাদী কর্মকাণ্ডের জন্য আলোচিত হয়।
এই অঞ্চলের সার্ব-অধ্যুষিত নেতৃত্বের সঙ্গে ইসরায়েলের এই ঘনিষ্ঠতা বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার অভ্যন্তরীণ ঐক্যের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে রিপাবলিকা সার্পস্কার অন্যতম প্রধান সমর্থক হিসেবে ইসরায়েল নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করছে। এই চেম্বার অব কমার্স উদ্বোধনের ফলে বলকান অঞ্চলে নতুন করে ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা সৃষ্টির সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
ইসরায়েলের এই পদক্ষেপটি মূলত তাদের দীর্ঘমেয়াদী কূটনৈতিক কৌশলের অংশ, যার মাধ্যমে তারা ইউরোপের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে নিজেদের অবস্থান সুসংহত করতে চায়। সার্বিক পরিস্থিতিতে এই কার্যালয়টি কেবল বাণিজ্যিক নয়, বরং রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক যোগাযোগের একটি নতুন কেন্দ্র হিসেবে কাজ করবে বলে মনে করা হচ্ছে। বলকান অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে আলবেনিয়া, বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা, বুলগেরিয়া, ক্রোয়েশিয়া, কসোভো, মন্টেনিগ্রো, উত্তর মেসিডোনিয়া, সার্বিয়া, স্লোভেনিয়া ও গ্রিস অন্তর্ভুক্ত।
এই পুরো অঞ্চলে ইসরায়েলের ক্রমবর্ধমান আগ্রহ ও তৎপরতা আগামী দিনগুলোতে আঞ্চলিক রাজনীতিতে কী ধরনের প্রভাব ফেলে, তা এখন দেখার বিষয়। ইসরায়েলের এই উদ্যোগের ফলে বলকান অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে বিদ্যমান সম্পর্কের সমীকরণেও পরিবর্তন আসতে পারে। বিশেষ করে ফিলিস্তিন ইস্যুতে ইউরোপীয় দেশগুলোর দৃষ্টিভঙ্গি এবং ইসরায়েলের সঙ্গে তাদের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে এই নতুন উন্নয়ন একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবক হিসেবে কাজ করতে পারে।
ইসরায়েলের পক্ষ থেকে এই উদ্যোগকে অর্থনৈতিক সহযোগিতার অংশ হিসেবে দাবি করা হলেও এর রাজনৈতিক তাৎপর্য অত্যন্ত গভীর। রিপাবলিকা সার্পস্কার বিচ্ছিন্নতাবাদী প্রকল্পের নেতা মিলোরাদ দোদিকের সঙ্গে ইসরায়েলি মন্ত্রীর এই সাক্ষাৎ ও কার্যালয় উদ্বোধন বলকান অঞ্চলে ইসরায়েলের বহুমুখী সমীকরণেরই বহিঃপ্রকাশ।
