বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে জোনাকির সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে কমে যাওয়ার তথ্য উঠে এসেছে গবেষকদের পর্যবেক্ষণে। বেলজিয়ামের গবেষক রাফায়েল দ্য ককের গবেষণায় দেখা গেছে, অতীতে যেসব এলাকায় প্রচুর জোনাকি দেখা যেত, বর্তমানে নগরায়ণ ও শিল্পায়নের ফলে সেসব স্থানে এদের অস্তিত্ব বিলীন হয়ে গেছে। পৃথিবীতে জোনাকির প্রায় ২ হাজার ৬০০টিরও বেশি প্রজাতি রয়েছে, যার মধ্যে মাত্র ১৫০টি প্রজাতির ওপর এখন পর্যন্ত বিস্তারিত বৈজ্ঞানিক মূল্যায়ন করা সম্ভব হয়েছে।
আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ ইউনিয়নের তথ্য অনুযায়ী, মূল্যায়িত প্রজাতিগুলোর প্রায় ২০ শতাংশ বর্তমানে বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে। জোনাকির এই সংখ্যা হ্রাসের পেছনে গবেষকরা মূলত পাঁচটি প্রধান কারণকে চিহ্নিত করেছেন। এর মধ্যে অন্যতম হলো আবাসস্থল ধ্বংস হওয়া। জলাভূমি, বনভূমি এবং ঘাসভূমিগুলো দ্রুত বাড়িঘর ও শিল্পকারখানায় রূপান্তরিত হওয়ায় জোনাকির বংশবিস্তারের প্রাকৃতিক পরিবেশ সংকুচিত হয়ে পড়ছে।
মালয়েশিয়ার ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চলে বসবাসকারী জোনাকির প্রজাতিগুলো পাম তেলের বাগান ও জলজ খামার তৈরির কারণে মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে। দ্বিতীয়ত, কৃত্রিম আলোকদূষণ জোনাকির জীবনচক্রে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। জোনাকি তাদের সঙ্গীকে আকর্ষণ করার জন্য শরীরের ভেতরে রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে আলো তৈরি করে। কিন্তু রাস্তার বাতি, বাণিজ্যিক সাইনবোর্ড এবং শহরের অতিরিক্ত কৃত্রিম আলোর কারণে তাদের এই সংকেত আদান-প্রদান ব্যাহত হচ্ছে।
গবেষকদের মতে, পৃথিবীর স্থলভাগের ২৩ শতাংশেরও বেশি এলাকা বর্তমানে রাতে কৃত্রিম আলোর প্রভাবে উজ্জ্বল থাকে, যা জোনাকির স্বাভাবিক প্রজনন প্রক্রিয়ায় বাধা সৃষ্টি করছে। তৃতীয়ত, কৃষিকাজে কীটনাশকের অতিরিক্ত ব্যবহার জোনাকির জন্য প্রাণঘাতী হয়ে দাঁড়িয়েছে। কীটনাশক সরাসরি জোনাকির জীবনচক্রের ক্ষতি করার পাশাপাশি তাদের খাদ্যের উৎস হিসেবে পরিচিত ছোট ছোট প্রাণীদেরও ধ্বংস করে দিচ্ছে।
চতুর্থত, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট দীর্ঘস্থায়ী খরা এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি উপকূলীয় অঞ্চলের জোনাকির আবাসস্থলকে প্লাবিত ও ধ্বংস করছে। সবশেষে, অনিয়ন্ত্রিত পর্যটন জোনাকির অস্তিত্বের জন্য নতুন ঝুঁকি তৈরি করেছে। প্রতিবছর প্রায় ২ লাখের বেশি মানুষ জোনাকি দেখার জন্য বিভিন্ন দেশে ভ্রমণ করেন। থাইল্যান্ডের ম্যানগ্রোভ নদীতে পর্যটকদের মোটরবোট চলাচলের ফলে তীরবর্তী গাছপালা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র ও মেক্সিকোর কিছু এলাকায় পর্যটকদের পায়ের নিচে চাপা পড়ে অনেক জোনাকি মারা যাচ্ছে। জোনাকির এই সংকট নিরসনে গবেষকরা বেশ কিছু পদক্ষেপের কথা জানিয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে প্রাকৃতিক আবাসস্থল সংরক্ষণ, রাতের বেলা অপ্রয়োজনীয় কৃত্রিম আলো নিয়ন্ত্রণ এবং কৃষিতে কীটনাশকের ব্যবহার কমিয়ে আনা। এছাড়া বাড়ির আঙিনায় জোনাকির জন্য উপযোগী পরিবেশ তৈরি এবং ঘাস কিছুটা লম্বা রাখা তাদের বংশবিস্তারে সহায়তা করতে পারে।
আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ ইউনিয়নের ফায়ারফ্লাই স্পেশালিস্ট গ্রুপ ২০১৮ সাল থেকে জোনাকির প্রজাতিগুলোর তালিকা তৈরি এবং তাদের সংরক্ষণগত অবস্থা মূল্যায়নের জন্য কাজ করে যাচ্ছে। গবেষকদের মতে, জোনাকির সংখ্যা কমে যাওয়ার বিষয়টি কেবল একটি পোকার বিলুপ্তি নয়, বরং এটি পরিবর্তিত প্রকৃতির একটি সতর্কবার্তা। দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষণ এবং সঠিক পর্যটন নীতিমালা প্রণয়নের মাধ্যমেই কেবল জোনাকির এই প্রাকৃতিক আলোকসজ্জাকে টিকিয়ে রাখা সম্ভব।
শিশুদের জোনাকি ধরার মতো শখের ক্ষেত্রেও সচেতনতা প্রয়োজন, যাতে ধরার পর তাদের আবার প্রকৃতিতে ছেড়ে দেওয়া হয়। সামগ্রিকভাবে, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় জোনাকির মতো পতঙ্গদের টিকে থাকা অপরিহার্য বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
