ব্রিকস জোটের দ্রুত সম্প্রসারণ এবং এর ফলে সৃষ্ট ভূ-রাজনৈতিক জটিলতা নিয়ে সদস্য দেশগুলোর শীর্ষ নেতাদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ২০২৩ সালে জোহানেসবার্গ সম্মেলনে ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন ও দক্ষিণ আফ্রিকার এই জোটটি বড় ধরনের সম্প্রসারণের ঘোষণা দেয়। এর ফলে জোটের সদস্য সংখ্যা পাঁচ থেকে বেড়ে দশটিতে উন্নীত হয়।
নতুন সদস্য হিসেবে মিসর, ইথিওপিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ইরান এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত যুক্ত হয়েছে। এছাড়া আরও দশটি দেশকে অংশীদার দেশ হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। তবে ১২ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত ১৮তম বার্ষিক সম্মেলনে যোগ দেওয়ার সময় বিশ্বনেতাদের মধ্যে এক ধরনের অস্বস্তি ও চাপা দুশ্চিন্তা লক্ষ্য করা গেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যে সম্প্রসারণকে বৈশ্বিক দক্ষিণের বা গ্লোবাল সাউথের বিজয়ের সূচনা হিসেবে দেখা হয়েছিল, তা এখন একটি বিশৃঙ্খল পরিবারের মতো পরিস্থিতির মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে। আয়োজক দেশ ভারত এবারের সম্মেলনে স্থিতিস্থাপকতা, উদ্ভাবন, সহযোগিতা ও টেকসই উন্নয়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ এজেন্ডা নির্ধারণ করলেও জোটের দ্রুত আয়তন বৃদ্ধির ফলে সৃষ্ট অভ্যন্তরীণ সংকটগুলো এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সম্প্রসারণের পরপরই জোটের ভেতরে মতপার্থক্য প্রকাশ্যে আসতে শুরু করে। বিশেষ করে আফ্রিকান অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যপদের সমর্থন নিয়ে বিরোধ দেখা দেয়। জানা যায়, নতুন সদস্য মিসর ও ইথিওপিয়া শুরুতে দক্ষিণ আফ্রিকাকে সমর্থন দেওয়ার বিষয়ে সম্মত থাকলেও পরবর্তীতে তা থেকে সরে আসে।
এর ফলে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর এবং ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকে কোনো যৌথ ঘোষণা বা বিবৃতি প্রকাশ করা সম্ভব হয়নি, যা ব্রিকসের ইতিহাসে নজিরবিহীন। এর আগে ২০১১ সাল থেকে প্রতিটি ঘোষণাপত্রে নিরাপত্তা পরিষদ সংস্কারের প্রস্তাবনায় দক্ষিণ আফ্রিকার পাশাপাশি ব্রাজিল ও ভারতের নাম নিয়মিতভাবে অন্তর্ভুক্ত ছিল।
কিন্তু রিও ডি জেনিরোতে অনুষ্ঠিত শীর্ষ সম্মেলনে গৃহীত ঘোষণাপত্র থেকে দক্ষিণ আফ্রিকার নামটি বাদ দেওয়া হয় এবং সেখানে শুধু ব্রাজিল ও ভারতের উল্লেখ রাখা হয়। পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে ২০২৬ সালের শুরুর দিকে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর। এই সংঘাত সংযুক্ত আরব আমিরাতেও ছড়িয়ে পড়লে ব্রিকসের ভঙ্গুর ঐক্য আরও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
মে মাসে অনুষ্ঠিত পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকে আবারও যৌথ ঘোষণা দিতে ব্যর্থ হয় জোটটি। জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টাদের বৈঠকে ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে তীব্র বাগ্বিতণ্ডা হয়। ইরান সন্ত্রাসবাদের সংজ্ঞায় ‘রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসবাদ’ শব্দবন্ধ যুক্ত করার দাবি জানায়, যা মূলত যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের দিকে ইঙ্গিত করে। তবে অধিকাংশ সদস্য দেশ এই চরম অবস্থানে যেতে রাজি হয়নি।
শেষ পর্যন্ত আয়োজক দেশ হিসেবে ভারত নিজস্ব একটি বিবৃতি প্রকাশ করতে বাধ্য হয়। এছাড়া সামরিক মহড়া নিয়েও জোটের ভেতরে বিভাজন দেখা দিয়েছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে দক্ষিণ আফ্রিকা চীন, ইরান ও রাশিয়ার সঙ্গে একটি যৌথ নৌ মহড়া পরিচালনা করে। প্রিটোরিয়া এটিকে ব্রিকসের মহড়া হিসেবে দাবি করলেও ভারতসহ অন্যান্য সদস্য দেশ এতে অংশ নেওয়া থেকে বিরত থাকে।
ভারত স্পষ্টভাবেই জানায় যে, এটি ব্রিকসের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রম নয়। মহড়ায় ইরানের উপস্থিতি নিয়ে ওয়াশিংটনের সমালোচনার মুখে দক্ষিণ আফ্রিকা সরকার ইরানিদের বাদ দেওয়ার নির্দেশ দিলেও তা কার্যকর করা নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়। এসব বিশৃঙ্খলা সত্ত্বেও ব্রিকসকে পুরোপুরি ব্যর্থ প্রকল্প বলা কঠিন। দুই দশকের কম সময়ে এটি ধনী পশ্চিমা বিশ্বের বাইরে একটি শক্তিশালী আন্তমহাদেশীয় ক্লাব হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে।
অর্থনৈতিক উৎপাদনের দিক থেকে এটি জি-৭ গোষ্ঠীকেও ছাড়িয়ে গেছে। নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক বা এনডিবি-এর সফল কার্যক্রম উন্নয়ন অর্থায়নের ক্ষেত্রে জোটটির বড় সাফল্য। তবে বর্তমান সংঘাতময় বিশ্বে নিরাপত্তা সংক্রান্ত এজেন্ডাগুলো জোটের জন্য বড় পরীক্ষার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ব্রিকসের মূল ভিত্তি ছিল অর্থনীতি ও অর্থায়ন, কিন্তু ২০০৯ সাল থেকে নিরাপত্তা ও ভূ-রাজনীতি এর আলোচনার অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে।
সামনে এগিয়ে যাওয়ার জন্য জোটটিকে চরমপন্থার প্রলোভন এড়িয়ে উন্নয়নমূলক সহায়তার পরিধি বাড়ানো এবং অরাষ্ট্রীয় সহিংসতা দমনে মনোনিবেশ করার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। এছাড়া দ্বিপক্ষীয় টানাপোড়েন নিরসনের একটি প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ব্রিকসকে কার্যকর রাখা গেলে তা উন্নয়নশীল বিশ্বের জন্য ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।
