দক্ষিণ কোরিয়ার রোমান্টিক কমেডি সিরিজ আওয়ার স্টিকি লাভ বিশ্বজুড়ে দর্শকদের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে। নেটফ্লিক্সের তথ্য অনুযায়ী, ১০ থেকে ১৬ আগস্ট পর্যন্ত সময়ে সিরিজটি বিশ্বব্যাপী নন-ইংলিশ টিভি সিরিজের তালিকায় প্রথম স্থান অর্জন করেছে। এই এক সপ্তাহে সিরিজটি ৭৫ লাখ ভিউ পেয়েছে এবং মোট দেখা হয়েছে প্রায় ৮ কোটি ৮০ লাখ ঘণ্টা।
সিরিজটি বিশ্বের ৬৮টি দেশের নেটফ্লিক্সের শীর্ষ ১০ তালিকায় জায়গা করে নিয়েছে। এর মধ্যে দক্ষিণ কোরিয়া, ব্রাজিল, ইন্দোনেশিয়া ও সিঙ্গাপুরসহ ২৬টি দেশে এটি তালিকার শীর্ষে রয়েছে। মুক্তির প্রথম সপ্তাহে সিরিজটি পঞ্চম অবস্থানে থাকলেও দ্বিতীয় সপ্তাহে চার ধাপ এগিয়ে শীর্ষে উঠে এসেছে। বাংলাদেশেও সিরিজটি নেটফ্লিক্সের জনপ্রিয়তার তালিকায় স্থান করে নিয়েছে।
বারো পর্বের এই সিরিজের মূল চরিত্রে অভিনয় করেছেন জুং হে-ইন। সিরিজের গল্পে প্রেম, রহস্য, অ্যাকশন এবং স্মৃতিভ্রমের মতো বিষয়গুলো উঠে এসেছে। গল্পের শুরুতে দেখা যায়, গো উন-সে নামের একজন উচ্চাকাঙ্ক্ষী প্রসিকিউটর একটি বিপজ্জনক তদন্তে জড়িয়ে পড়েন। এক পর্যায়ে গুরুতর হামলার শিকার হয়ে তিনি স্মৃতিশক্তি হারিয়ে ফেলেন।
এরপর জ্যাং তে-হা নামের একজন প্রাক্তন বক্সিং প্রতিভা তাঁর জীবনে হাজির হন এবং নিজেকে উন-সের প্রেমিক হিসেবে দাবি করেন। তবে স্মৃতিভ্রমের কারণে উন-সে এই দাবি নিয়ে সন্দিহান থাকেন। ধীরে ধীরে গল্পের রহস্য উন্মোচিত হতে থাকে এবং জানা যায় যে, এই সম্পর্কের আড়ালে অপরাধ জগতের যোগসূত্র ও দুর্নীতির তদন্তের মতো জটিল বিষয় রয়েছে।
সিরিজের প্রধান অভিনেতা জুং হে-ইন তাঁর আগের বিভিন্ন কাজের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক দর্শকদের কাছে পরিচিতি পেয়েছেন। এই সিরিজে তাঁর অভিনয় এবং চরিত্রের দ্বৈততা দর্শকদের আকৃষ্ট করেছে। একদিকে কঠিন অতীতের মানুষ এবং অন্যদিকে প্রেমিকার নিরাপত্তার জন্য নিজের পরিচয় গোপন রাখা—এই বিষয়গুলো চরিত্রটিকে দর্শকদের কাছে আকর্ষণীয় করে তুলেছে।
সিরিজটি মুক্তির দিন থেকেই অন্যতম প্রধান অভিনেত্রী হা ইয়ংকে ঘিরে বড় ধরনের বিতর্ক তৈরি হয়। একটি টেলিভিশন অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে তিনি তাঁর প্রপিতামহ আন সাং-হোর চিকিৎসা পেশা ও ইতিহাস নিয়ে কথা বলেন। পরবর্তীতে ঐতিহাসিক নথিপত্র থেকে জানা যায় যে, ১৯১৬ সালে তাঁর প্রপিতামহ জাপানি ঔপনিবেশিক শাসনামলে কোরিয়া ও জাপানের একীভূতকরণের পক্ষে কাজ করা একটি সংগঠনের কাউন্সিল সদস্য ছিলেন।
দক্ষিণ কোরিয়ায় জাপানি ঔপনিবেশিক শাসনের ইতিহাস অত্যন্ত স্পর্শকাতর বিষয় হওয়ায় এই তথ্য প্রকাশের পর ব্যাপক সমালোচনার সৃষ্টি হয়। বিতর্কের মুখে হা ইয়ংয়ের ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান বিস্টাস এন্টারটেইনমেন্ট বিষয়টি স্বীকার করে এবং ক্ষমা প্রার্থনা করে। অভিনেত্রী নিজেও হাতে লেখা চিঠির মাধ্যমে দুঃখ প্রকাশ করেন। এই বিতর্কের প্রভাব সিরিজটির প্রচারণায় পড়েছিল।
হা ইয়ংয়ের নির্ধারিত বেশ কিছু সাক্ষাৎকার ও গোলটেবিল বৈঠক বাতিল করা হয়। তবে প্রচারণায় বাধা এলেও দর্শকসংখ্যায় এর কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়েনি। বরং সিরিজটি বিশ্বজুড়ে ব্যাপক দর্শকপ্রিয়তা পায়। বিশ্লেষকদের মতে, জুং হে-ইনের তারকাখ্যাতি, গল্পের বৈচিত্র্য এবং কোরিয়ান কনটেন্টের প্রতি বৈশ্বিক আগ্রহ এই সাফল্যের পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে।
যদিও বিতর্ক সিরিজটিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বাড়তি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে এসেছিল, তবে মূল সাফল্যের পেছনে সিরিজের নিজস্ব গুণমানই কাজ করেছে বলে মনে করা হচ্ছে। নেটফ্লিক্সের হিসাবে ভিউ বলতে মোট দেখা সময়কে সিরিজের দৈর্ঘ্য দিয়ে ভাগ করে পাওয়া সংখ্যা বোঝানো হয়, যা সিরিজটির প্রতি দর্শকদের প্রবল আগ্রহের একটি শক্তিশালী সূচক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বাংলাদেশের দর্শকদের কাছেও কোরিয়ান সিরিজের জনপ্রিয়তা দীর্ঘদিনের। এই সিরিজের ক্ষেত্রে রোমান্টিক গল্পের পাশাপাশি থ্রিলার ও রহস্যের সংমিশ্রণ দর্শকদের ধরে রাখতে সাহায্য করেছে। একজন নারী নিজের পরিচয় ভুলে যাওয়া এবং একজন পুরুষের রহস্যময় দাবি—এই কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা গল্পটি দর্শকদের কৌতূহল বজায় রেখেছে। সব মিলিয়ে, প্রচারণায় নানা প্রতিকূলতা সত্ত্বেও আওয়ার স্টিকি লাভ বর্তমান সময়ে নেটফ্লিক্সের অন্যতম সফল সিরিজ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
