পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পর্যটন বিভাগের নতুন একটি বিজ্ঞাপনচিত্র নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনা ও বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। গত শুক্রবার ধনধান্য অডিটোরিয়ামে রাজ্যের নতুন পর্যটন লোগো ও ব্র্যান্ড পরিচয় উন্মোচন করেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। এই আয়োজনে রাজ্যের পর্যটন অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য ৫০০ কোটি রুপি বিনিয়োগের ঘোষণা দেওয়া হয়।
নতুন এই প্রচারণার স্লোগান নির্ধারণ করা হয়েছে ‘ওয়েস্ট বেঙ্গল: হোয়্যার ইন্ডিয়া ফিলস ডিফারেন্ট’। তবে এই নতুন ব্র্যান্ডিংয়ের অংশ হিসেবে প্রকাশিত বিজ্ঞাপনটি নিয়ে সাধারণ মানুষ ও বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে। বিজ্ঞাপনটির শুরুতে পশ্চিমবঙ্গের প্রতীকী হাওড়া ব্রিজের দৃশ্য দেখা গেলেও, পরবর্তী অংশে রাজ্যের কোনো দর্শনীয় স্থানের পরিবর্তে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিখ্যাত স্থাপনা প্রদর্শন করা হয়েছে।
বিজ্ঞাপনটিতে ফ্রান্সের আইফেল টাওয়ার, রাশিয়ার সেন্ট বাসিলস ক্যাথেড্রাল, মিশরের পিরামিড এবং ব্রাজিলের ক্রাইস্ট দ্য রিডিমার মূর্তির মতো স্থাপনাগুলো পর্যায়ক্রমে দেখানো হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের পর্যটন প্রচারের জন্য তৈরি এই ভিডিওতে রাজ্যের নিজস্ব কোনো পর্যটন কেন্দ্রের দৃশ্য না থাকায় দর্শক ও সমালোচকরা বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। পশ্চিমবঙ্গের ভৌগোলিক বৈচিত্র্য অত্যন্ত সমৃদ্ধ।
রাজ্যের দক্ষিণে রয়েছে সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ বন এবং উত্তরে হিমালয়ের পাদদেশের তুষারঢাকা পাহাড়। এছাড়া ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল, দার্জিলিংয়ের পাহাড়ি সৌন্দর্য কিংবা বিষ্ণুপুরের ঐতিহাসিক টেরাকোটা মন্দিরের মতো অসংখ্য দর্শনীয় স্থান থাকা সত্ত্বেও বিজ্ঞাপনে সেগুলোর অনুপস্থিতি নিয়ে সমালোচনা হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন, রাজ্যের পর্যটন প্রসারের বিজ্ঞাপনে কেন বিদেশের স্থাপনাগুলো প্রাধান্য পেল।
বিজ্ঞাপনটির বিষয়বস্তু নিয়ে রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনেও নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। তৃণমূল কংগ্রেসের সংসদ সদস্য ডেরেক ও’ব্রায়েন এই বিজ্ঞাপনচিত্রের তীব্র সমালোচনা করে একে অত্যন্ত নিম্নমানের বলে অভিহিত করেছেন। এছাড়া সাবেক রাজ্যপাল তথাগত রায় বিজ্ঞাপনটিকে অপেশাদার ও অগ্রহণযোগ্য হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি অবিলম্বে এই বিজ্ঞাপনটি সরিয়ে নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
তার মতে, পশ্চিমবঙ্গের পর্যটন প্রচারণায় মস্কো, মিশর বা রিও ডি জেনিরোর মতো বিদেশি শহরের দৃশ্য থাকা অযৌক্তিক। বিজ্ঞাপনটি তৈরির প্রক্রিয়া ও এর পেছনের উদ্দেশ্য নিয়েও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা ব্যঙ্গাত্মক মন্তব্য করা হচ্ছে। অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন, এই বিজ্ঞাপন তৈরির দায়িত্ব কোন সংস্থাকে দেওয়া হয়েছিল এবং তারা কেন রাজ্যের নিজস্ব ঐতিহ্যকে তুলে ধরার পরিবর্তে বিদেশের স্থাপনা ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নিল।
রাজ্যের পর্যটন বিভাগ আন্তর্জাতিক মানচিত্রে পশ্চিমবঙ্গকে আরও জোরালোভাবে তুলে ধরার লক্ষ্য নিয়ে এই নতুন ব্র্যান্ডিং ও বিনিয়োগের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। তবে প্রচারণার এই কৌশলটি সাধারণ মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পায়নি। রাজ্যের পর্যটন অবকাঠামো উন্নয়নে ৫০০ কোটি রুপি বিনিয়োগের মতো বড় একটি উদ্যোগের পাশাপাশি বিজ্ঞাপনের এই বিতর্কিত বিষয়টি এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
সমালোচকদের মতে, পর্যটন বিজ্ঞাপনের মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত দর্শকদের রাজ্যের দর্শনীয় স্থানগুলোর প্রতি আকৃষ্ট করা, যা এই বিজ্ঞাপনচিত্রের মাধ্যমে অর্জিত হয়নি। বিজ্ঞাপনটি নিয়ে তৈরি হওয়া এই বিতর্ক রাজ্যের পর্যটন প্রচারণার ভবিষ্যৎ কৌশলের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন অনেকে।
