নেপালে সাম্প্রতিক সময়ের ভয়াবহ পাহাড়ি ঢলে নিহতের সংখ্যা এক হাজার ছাড়িয়েছে এবং চার হাজারের বেশি মানুষ এখনো নিখোঁজ রয়েছেন। দেশটির বিভিন্ন এলাকায় আকস্মিক এই দুর্যোগে ঘরবাড়ি ও অবকাঠামো ধ্বংস হওয়ার পাশাপাশি জলবিদ্যুৎকেন্দ্রের সুড়ঙ্গে আটকা পড়েছেন বহু শ্রমিক। উদ্ধারকাজে নেপাল সেনাবাহিনীর পাশাপাশি চীন ও ভারতের বিশেষজ্ঞরা খননযন্ত্র ও ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে যৌথভাবে কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।
উদ্ধারকর্মীরা জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোর ধ্বংসাবশেষ সরিয়ে আটকে পড়া শ্রমিকদের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করছেন। নেপালের সেনাবাহিনীর মুখপাত্র রাজা রাম বাসনেত জানিয়েছেন, সেনাবাহিনী সুড়ঙ্গগুলোতে অনুসন্ধান ও উদ্ধারকাজে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। একই সঙ্গে মরদেহ উদ্ধার এবং দুর্যোগপূর্ণ এলাকায় রোগের বিস্তার ঠেকাতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। সেনাবাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, গত মঙ্গলবার ১১৯ জনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে।
দুর্যোগের ভয়াবহতা বর্ণনা করতে গিয়ে বেঁচে ফেরা শ্রমিক পেমবা দুনদু তামাং জানান, ত্রিশূলী নদীর ওপর একটি জলবিদ্যুৎকেন্দ্রের সুড়ঙ্গে কংক্রিটের আস্তর দেওয়ার সময় হঠাৎ প্রবল বাতাসের ঝাপটা ও পানির তোড় শুরু হয়। তিনি প্রাণ বাঁচাতে প্রায় ২০ মিনিট দৌড়ে পাহাড়ে আশ্রয় নেন। তামাং জানান, সুড়ঙ্গে কাজ করা প্রায় ৩০ জনের দলের অনেকেই এখনো নিখোঁজ রয়েছেন।
এই দুর্যোগে তামাং তাঁর মা, বড় ভাই, ভাবিসহ পরিবারের ছয় সদস্যকে হারিয়েছেন। একই প্রকল্পে কাজ করা ইথা ঘালে জানান, প্রবল বাতাসের ঝাপটায় তাঁদের প্রায় উড়িয়ে নেওয়ার উপক্রম হয়েছিল। তিনিও এই দুর্যোগে তাঁর মা ও বড় মেয়েসহ পরিবারের আট সদস্যকে হারিয়েছেন। নেপালের বিদ্যুৎ চাহিদার ৯৯ শতাংশের বেশি জলবিদ্যুৎ থেকে আসে।
ক্ষতিগ্রস্ত ‘আপার ত্রিশূলী ৩বি’ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের মতো একাধিক প্রকল্পে কর্মরত শ্রমিকরা এখন ভবিষ্যৎ নিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছেন। তামাং বলেন, দুর্যোগের পর প্রকল্পের কাজ বন্ধ হয়ে গেলে তাঁদের জীবনধারণ কঠিন হয়ে পড়বে। তিনি আরও জানান, সুড়ঙ্গে আটকা পড়া অনেক সহকর্মীকে তিনি চেনেন এবং দ্রুত উদ্ধারকাজ সম্পন্ন হলে তাঁদের অনেকের বেঁচে ফেরার সম্ভাবনা রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, দুর্যোগের কয়েক দিন আগে হিমবাহের আশপাশে অস্বাভাবিক লক্ষণ দেখা গিয়েছিল। স্যাটেলাইট চিত্রে বরফ গলে পানি জমা এবং পাহাড়ি পাথরে ফাটল তৈরির বিষয়টি ধরা পড়েছিল। এশিয়ান মাউন্টেন একাডেমিক অ্যালায়েন্স, স্টিমসন সেন্টার ও চীনের ইনস্টিটিউট অব মাউন্টেন হ্যাজার্ডস অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টের বিশেষজ্ঞরা জানান, পাহাড়ের ঢালে এই অস্বাভাবিকতাগুলো দুর্যোগের পূর্বাভাস ছিল।
তবে ঢল এতটাই দ্রুতগতিতে নেমে এসেছিল যে প্রচলিত সতর্কব্যবস্থা দিয়ে কাছাকাছি থাকা মানুষদের সতর্ক করা সম্ভব হয়নি। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ভাটির দিকের এলাকাগুলোতে সমন্বিত আগাম সতর্কব্যবস্থা থাকলে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মানুষের প্রাণ বাঁচানো যেত। বর্তমানে উদ্ধারকর্মীরা সুড়ঙ্গগুলোতে বাতাস সরবরাহের ব্যবস্থা করছেন যাতে আটকে পড়া ব্যক্তিদের শ্বাস-প্রশ্বাস স্বাভাবিক থাকে।
নেপালের বিভিন্ন স্থানে পুলিশ স্টেশনের সামনে নিখোঁজ স্বজনদের নাম নিবন্ধন করতে মানুষের দীর্ঘ সারি দেখা যাচ্ছে। উদ্ধারকাজ এখনো চলমান রয়েছে এবং ধ্বংসস্তূপের নিচে আরও মরদেহ বা জীবিত ব্যক্তি থাকার আশঙ্কা করা হচ্ছে। নেপালের সেনাবাহিনী ও আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ দলগুলো সমন্বিতভাবে উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করছে যাতে যত দ্রুত সম্ভব নিখোঁজ ব্যক্তিদের সন্ধান পাওয়া যায় এবং ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়।
এই দুর্যোগ নেপালের অবকাঠামো ও জনজীবনে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে, যার ফলে হাজারো মানুষ এখন গৃহহীন ও স্বজনহারা অবস্থায় মানবেতর জীবনযাপন করছেন। উদ্ধার অভিযান ও পরবর্তী পুনর্বাসন প্রক্রিয়া নিয়ে সরকার ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো কাজ করছে।
