নেপালের ভয়াবহ বন্যায় নিখোঁজ হওয়ার ১১ দিন পর চন্দিকা শ্রেষ্ঠা নামের ৬৪ বছর বয়সী এক নারীকে জীবিত উদ্ধার করেছেন উদ্ধারকারীরা। ভোতেকোশি নদীর প্রবল স্রোতে বাড়িঘর ভেসে যাওয়ার পর দীর্ঘ সময় ধরে তার কোনো সন্ধান না পাওয়ায় পরিবার তাকে মৃত বলে ধরে নিয়েছিল। এমনকি তার শেষকৃত্যের আনুষ্ঠানিকতাও শুরু করেছিল পরিবার।
নেপালের বেত্রাবতী বাজারের একটি বাড়ি থেকে অচেতন অবস্থায় তাকে উদ্ধার করা হয়। সশস্ত্র পুলিশ বাহিনীর পরিদর্শক সুমন বিকের নেতৃত্বে এই উদ্ধার অভিযান পরিচালিত হয়। চন্দিকা শ্রেষ্ঠা নুয়াকোটের বিদুর পৌরসভা-১০ এলাকার বাসিন্দা। বন্যার সময় তিনি তার স্বামীর সঙ্গে বাড়িতে অবস্থান করছিলেন। প্রবল স্রোতের তোড়ে তাদের সাড়ে চারতলা বাড়িটি উপড়ে ভেসে যায়।
পরবর্তীতে বাড়িটি ত্রিশূলী নদীর তীরে কোথাও আটকে যায় বলে জানিয়েছেন চন্দিকার সম্বন্ধী রমেশ মান শ্রেষ্ঠা। ঘটনার পর থেকে টানা আট দিন ধরে পরিবার তাকে বিভিন্ন স্থানে খুঁজেছে। কোথাও কোনো সন্ধান না পেয়ে এক পর্যায়ে তারা আশা ছেড়ে দেয়। রমেশ মান শ্রেষ্ঠা জানান, পরিবারের সদস্যরা কুশ ঘাস দিয়ে চন্দিকার প্রতীকী মরদেহ তৈরি করে অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার আনুষ্ঠানিকতা শুরু করেছিলেন।
চন্দিকার জামাইও দুই-তিন দিন ধরে ত্রিশূলী ও বেত্রাবতী নদীর তীরবর্তী এলাকায় তাকে খুঁজেছেন। তবে ওই এলাকাগুলোতে প্রবেশ করা উদ্ধারকারীদের জন্য অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছিল। বন্যার কারণে সৃষ্ট গভীর কাদা ও জলাবদ্ধতার পাশাপাশি আশপাশে মরদেহ পচতে শুরু করায় তীব্র দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছিল। মাস্ক ছাড়া সেখানে অবস্থান করা অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছিল বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
উদ্ধার অভিযানের এক পর্যায়ে ১১তম দিনে চন্দিকাকে জীবিত অবস্থায় পাওয়া যায়। উদ্ধারের পরপরই তাকে হেলিকপ্টারে করে ত্রিশূলীর নেপাল আর্মির মাইবাল ব্যারাকে নেওয়া হয়। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা প্রদানের পর তাকে কাঠমান্ডুর ছাউনির আর্মি হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়েছে। বর্তমানে তিনি চিকিৎসকদের নিবিড় পর্যবেক্ষণে রয়েছেন। চিকিৎসকরা পরিবারকে তার শারীরিক অবস্থার উন্নতির জন্য অন্তত ৭২ ঘণ্টা অপেক্ষা করতে বলেছেন।
হাসপাতালের বাইরে থেকে দূর থেকেই তাকে দেখার চেষ্টা করছেন স্বজনরা। চন্দিকার নাতিও হাসপাতালে তার সঙ্গে রয়েছে। পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, নানিকে হাসপাতালে দেখার পর থেকে নাতি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছে এবং ঠিকমতো খাওয়া-দাওয়া করছে না। দীর্ঘ আট দিনের অনিশ্চয়তা, শেষকৃত্যের আনুষ্ঠানিকতা এবং সবশেষে চন্দিকার জীবিত ফিরে আসার ঘটনাটিকে পরিবারের সদস্যরা অলৌকিক বলে বর্ণনা করেছেন।
রমেশ মান শ্রেষ্ঠা বলেন, এই ঘটনার পর তাদের বিশ্বাস আরও দৃঢ় হয়েছে যে পৃথিবীতে ঈশ্বর আছেন। বন্যার কবলে পড়ে হাজার হাজার পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং চন্দিকার পরিবারও সেই দুর্যোগের শিকার হয়েছিল। উদ্ধার তৎপরতা এবং পরবর্তীতে তাকে হাসপাতালে স্থানান্তরের পুরো প্রক্রিয়াটি নেপাল পুলিশ ও সেনাবাহিনীর সমন্বয়ে সম্পন্ন হয়েছে।
বর্তমানে চন্দিকার শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছেন তার পরিবারের সদস্যরা। হাসপাতালের চিকিৎসকরা তাকে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রেখে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সেবা প্রদান করছেন। বন্যার ভয়াবহতা কাটিয়ে চন্দিকার এই ফিরে আসা স্থানীয় পর্যায়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। উদ্ধারকারী দল এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, প্রতিকূল পরিবেশ সত্ত্বেও তাকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে।
চন্দিকার পরিবার এখন তার দ্রুত সুস্থতার অপেক্ষায় রয়েছে।
