নেপালের নুয়াকোট জেলায় অবস্থিত ত্রিশূলী-৩এ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সুড়ঙ্গ থেকে আকস্মিক বন্যায় আটকা পড়ার নয় দিন পর সঞ্জয় সাহ ও কবির মহারজন নামের দুই শ্রমিককে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। শুক্রবার নেপালি সেনাবাহিনীর উদ্ধারকারী দল ও চিকিৎসকদের সমন্বিত প্রচেষ্টায় তাদের সুড়ঙ্গ থেকে নিরাপদে বের করে আনা হয়।
গত ২৬ আগস্ট ত্রিশূলী উপত্যকায় আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসের ফলে এই দুর্ঘটনা ঘটে। উদ্ধার হওয়া শ্রমিকদের মধ্যে সঞ্জয় সাহ সপ্তরি জেলার বাসিন্দা এবং তিনি প্রকল্পটিতে মেকানিক্যাল ফোরম্যান হিসেবে কর্মরত ছিলেন। অপর উদ্ধার হওয়া শ্রমিক কবির মহারজন কাঠমান্ডুর বাসিন্দা। উদ্ধার হওয়ার পরপরই নেপালি সেনাবাহিনীর মেডিক্যাল টিমের কাছে সঞ্জয় সাহ দুর্ঘটনার সময়ের পরিস্থিতির বর্ণনা দেন।
তিনি জানান, যখন পাহাড়ি ঢল ও ভূমিধসের কারণে সুড়ঙ্গে পানি প্রবেশ করতে শুরু করে, তখন তিনি নিয়ন্ত্রণকক্ষে দায়িত্ব পালন করছিলেন। নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তিনি প্রথমে অন্য সহকর্মীদের দ্রুত সুড়ঙ্গ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেন এবং তাদের নিরাপদ আশ্রয়ে পাঠানোর উদ্যোগ গ্রহণ করেন। সঞ্জয় সাহ জানান, অন্যদের জীবন বাঁচানোর দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তিনি নিজের বের হওয়ার জন্য পর্যাপ্ত সময় পাননি।
সবাইকে নিরাপদে বের করে দেওয়ার প্রক্রিয়ায় ব্যস্ত থাকায় শেষ মুহূর্তে তিনি সুড়ঙ্গ থেকে আর বেরিয়ে আসতে সক্ষম হননি। সুড়ঙ্গের ভেতর আটকে থাকা দীর্ঘ নয়টি দিন সম্পর্কে সঞ্জয় সাহ জানান, তিনি উদ্ধারের আশায় প্রহর গুনছিলেন এবং নিয়মিত ঈশ্বরকে স্মরণ করছিলেন। সুড়ঙ্গের ভেতর আটকে থাকা অবস্থায় তিনি খুব কাছাকাছি থাকা তিন থেকে চারজন ব্যক্তির কণ্ঠস্বর শুনতে পেয়েছিলেন এবং তাদের সঙ্গে শব্দ করে যোগাযোগ স্থাপনের চেষ্টা করেছিলেন।
তবে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন যে, সুড়ঙ্গটি অনেক দীর্ঘ হওয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রের আশপাশে আরও অনেক শ্রমিক আটকা পড়ে থাকতে পারেন। বন্যার পানির তীব্র স্রোত অনেককে সুড়ঙ্গের আরও গভীরে ভাসিয়ে নিয়ে গিয়ে থাকতে পারে বলেও তিনি ধারণা করছেন। উদ্ধারকারী দল ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, সুড়ঙ্গের ভেতরে আটকে থাকা অন্যান্য শ্রমিকদের বেঁচে থাকার সম্ভাবনা নিয়ে তারা কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।
সঞ্জয় সাহের ভাষ্যমতে, সুড়ঙ্গে আরও মানুষ আটকা পড়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না, কারণ দুর্যোগের সময় সবাই দ্রুত বেরিয়ে আসতে পারেননি। নয় দিন পর অলৌকিকভাবে জীবিত উদ্ধার হওয়া এই দুই শ্রমিক বর্তমানে চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণে রয়েছেন। নেপাল-তিব্বত সীমান্তে অবস্থিত এই জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসের ঘটনাটি অত্যন্ত ভয়াবহ ছিল।
উদ্ধার অভিযানের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, সুড়ঙ্গের ভেতর প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও দুই শ্রমিকের বেঁচে থাকা একটি বড় ঘটনা। উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের শারীরিক অবস্থা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হচ্ছে এবং তাদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সেবা প্রদান করা হচ্ছে। সুড়ঙ্গের ভেতর আটকে থাকা অন্যান্যদের সন্ধানে উদ্ধার তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে কি না, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ করছে।
সঞ্জয় সাহের এই সাহসিকতার বিষয়টি উদ্ধারকারী দলের সদস্যদের কাছে বিশেষভাবে আলোচিত হয়েছে। তিনি নিজের জীবনের চেয়ে সহকর্মীদের নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিয়ে যে দায়িত্ববোধের পরিচয় দিয়েছেন, তা উদ্ধারকারী দলের সদস্যরা উল্লেখ করেছেন। বর্তমানে উদ্ধার হওয়া দুই শ্রমিক সুস্থ হওয়ার পথে রয়েছেন এবং তাদের পরিবারের কাছে হস্তান্তরের প্রক্রিয়া চলছে।
পুরো ঘটনাটি নেপালের জলবিদ্যুৎ খাতের নিরাপত্তা ও দুর্যোগকালীন প্রস্তুতির বিষয়টি নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে। উদ্ধার হওয়া শ্রমিকদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে সুড়ঙ্গের ভেতরের পরিস্থিতি সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়ার চেষ্টা করছেন উদ্ধারকারীরা।
