নেপালের ভয়াবহ আকস্মিক বন্যায় নিখোঁজ হওয়া ১৯ বছর বয়সী ছেলে বিনোদকে খুঁজতে মাইলের পর মাইল পথ পাড়ি দিচ্ছেন তার বাবা তালকা সাদা। গত ২৬ আগস্ট নেপালের উত্তরাঞ্চলে আঘাত হানা বন্যার পর থেকে বিনোদের কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। বিনোদ নেপালের রাসুয়া জেলায় একটি জলবিদ্যুৎকেন্দ্রে শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন।
বন্যার এক দিন আগে শেষবার তার বাবার সঙ্গে কথা হয়েছিল। বিনোদের সঙ্গে কাজ করা আরও চার তরুণও নিখোঁজ রয়েছেন বলে জানা গেছে। তালকা সাদার বাড়ি নেপালের তেরাই অঞ্চলের সপ্তরি জেলায়। তিনি তার ভাইয়ের সঙ্গে ছেলেকে খুঁজতে রাজধানী কাঠমান্ডু থেকে শুরু করে বিভিন্ন দুর্গম এলাকায় ঘুরে বেড়াচ্ছেন।
ছেলেকে খুঁজে পাওয়ার আশায় তিনি ধার করে টাকা সংগ্রহ করেছেন। এই অর্থ দিয়ে তারা কাঠমান্ডু পর্যন্ত বাসে ভ্রমণ করেছেন এবং এরপর থেকে পায়ে হেঁটে বিভিন্ন হাসপাতাল ও উদ্ধারকারী ক্যাম্পের দিকে যাচ্ছেন। তালকা সাদা জানান, তিনি কাঠমান্ডুর বিভিন্ন হাসপাতালে গিয়ে নিখোঁজদের তালিকায় ছেলের নাম খুঁজেছেন এবং মর্গে রাখা মরদেহের ছবিগুলো দেখেছেন, কিন্তু কোথাও বিনোদের সন্ধান মেলেনি।
কাঠমান্ডু থেকে নুওয়াকোটের দিকে যাওয়ার পথে তারা ত্রিশূলি শহরের ধ্বংসস্তূপের মধ্য দিয়ে দীর্ঘ সময় হেঁটেছেন। সাদার অভিযোগ, উদ্ধারকারী সেনা ক্যাম্পগুলোতে তাদের প্রবেশ করতে দেওয়া হচ্ছে না এবং কর্তৃপক্ষ তাদের সহায়তা করছে না। তিনি মনে করেন, তাদের জাতিগত পরিচয় এবং নেপালি ভাষায় সাবলীল না হওয়ার কারণে তাদের প্রতি বৈষম্য করা হচ্ছে।
সাদার পরিবার নেপালের প্রান্তিক মুসাহার সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত। তারা বারবার থানা ও সেনা ক্যাম্পে নিজেদের নাম নিবন্ধন করলেও কোনো সাড়া পাচ্ছেন না। অন্যদিকে, নেপাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে যে ভয়াবহ এই দুর্যোগের ব্যাপকতায় উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনা করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে। এখন পর্যন্ত এই বন্যায় এক হাজারেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন এবং হাজারো মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন।
কর্তৃপক্ষ দাবি করেছে, এই পরিস্থিতির মধ্যেও তারা জীবিতদের খুঁজে বের করার এবং ত্রাণ সহায়তা দেওয়ার সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তালকা সাদা তার ছেলের ফোন নম্বরে বারবার কল করলেও কোনো সাড়া পাচ্ছেন না। তিনি জানান, তার স্ত্রী বাড়িতে অত্যন্ত মানবেতর অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন এবং ছেলেকে ফিরিয়ে আনার জন্য তাকে বারবার অনুরোধ করছেন।
একদিকে ছেলেকে ফিরে পাওয়ার ক্ষীণ আশা এবং অন্যদিকে চরম অসহায়ত্ব নিয়ে এই বাবা তার যাত্রা অব্যাহত রেখেছেন। তিনি বিশ্বাস করেন, তার ছেলে তরুণ এবং পরিশ্রমী হওয়ায় হয়তো কোথাও আশ্রয় নিয়েছে। তবে দীর্ঘ সময় কোনো যোগাযোগ না হওয়ায় তার মনে গভীর শঙ্কাও কাজ করছে। সবশেষে, কোনো উপায় না পেয়ে তিনি আবারও সেই জলবিদ্যুৎকেন্দ্রের দিকে হাঁটা শুরু করেছেন যেখানে তার ছেলে কাজ করত।
নিজের কাছে থাকা সামান্য টাকা শেষ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হলেও তিনি হাল ছাড়তে রাজি নন। নিখোঁজ ছেলের সন্ধানে তার এই দীর্ঘ ও ক্লান্তিকর যাত্রা নেপালের দুর্যোগকবলিত এলাকার মানুষের অসহায়ত্বের একটি চিত্র তুলে ধরেছে।
