ইরান দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের জন্য সামরিক প্রস্তুতি গ্রহণ করছে বলে জানিয়েছেন প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক উলফগ্যাং পিসতাই। তিনি মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে ইরান এখনো দীর্ঘ সময় ধরে সামরিক সংঘাত চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা বজায় রেখেছে। যদিও যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক হামলায় ইরান বেশ কিছু বড় ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে, তবুও দেশটির সামরিক সক্ষমতা পুরোপুরি অচল হয়ে পড়েনি।
উলফগ্যাং পিসতাইয়ের মতে, ইরান সামরিক দিক থেকে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত রয়েছে এবং তারা এখনো হরমুজ প্রণালিতে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালানোর মতো সক্ষমতা ধরে রেখেছে। এই কৌশলগত অবস্থান ইরানকে দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতের ক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট মাত্রার সামরিক শক্তি প্রদান করছে। বিশ্লেষক পিসতাইয়ের ভাষ্যমতে, যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে বিষয়টি সামরিক সক্ষমতার চেয়ে বেশি রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের দিকে মোড় নিচ্ছে।
তিনি উল্লেখ করেন যে, বিভিন্ন প্রতিবেদনে মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত কমে যাওয়ার কথা বলা হলেও বাস্তবে পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক মজুত হয়তো ততটা হ্রাস পায়নি যতটা ধারণা করা হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জটি এখন রাজনৈতিক। পিসতাইয়ের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের সম্ভাবনা রয়েছে।
বিশেষ করে আগামী মধ্যবর্তী নির্বাচনে যদি কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্র্যাটদের হাতে চলে যায়, তবে সংঘাতের গতিপ্রকৃতি বদলে যেতে পারে। তবে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ পরিবর্তন হলেও সংঘাত যে পুরোপুরি শেষ হয়ে যাবে, এমনটি মনে করার কোনো কারণ নেই। বরং সেক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র সামরিক পদক্ষেপের তুলনায় অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগ এবং অন্যান্য অর্থনৈতিক কৌশল ব্যবহারের ওপর আরও বেশি গুরুত্বারোপ করতে পারে।
পিসতাইয়ের মতে, ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্র সামরিক শক্তির চেয়ে অর্থনৈতিক অবরোধ ও কৌশলের ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে উঠতে পারে। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালিতে নৌ অবরোধের বিষয়টিও অব্যাহত থাকবে বলে তিনি ধারণা করছেন। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার এই চলমান উত্তেজনার প্রভাব বিশ্ব রাজনীতি ও অর্থনীতির ওপর গভীর প্রভাব ফেলছে।
হরমুজ প্রণালি বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম প্রধান পথ হওয়ায় সেখানে যেকোনো ধরনের সামরিক তৎপরতা বা নৌ অবরোধ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইরান তাদের সামরিক সক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার চেষ্টা করছে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র তাদের মিত্রদের সহায়তায় এই অঞ্চলে নিজেদের সামরিক উপস্থিতি ও প্রভাব ধরে রাখার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান এই দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতের কোনো সহজ সমাধান নেই। উভয় পক্ষই তাদের নিজ নিজ কৌশলগত অবস্থান থেকে সরে আসতে নারাজ। ইরান যেখানে সামরিক সক্ষমতা প্রদর্শনের মাধ্যমে নিজেদের অস্তিত্ব ও প্রভাব টিকিয়ে রাখতে চায়, সেখানে যুক্তরাষ্ট্র অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চাপের মাধ্যমে ইরানকে কোণঠাসা করার চেষ্টা করছে।
এই দ্বিমুখী লড়াইয়ের ফলে মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে এক অস্থির পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। পিসতাইয়ের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, আগামী দিনগুলোতে সংঘাতের ধরন পরিবর্তিত হতে পারে। সামরিক লড়াইয়ের পাশাপাশি অর্থনৈতিক যুদ্ধ এবং কূটনৈতিক চাপ প্রয়োগের বিষয়টি আরও প্রকট হয়ে উঠবে। ইরান দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের জন্য যে প্রস্তুতি নিচ্ছে, তা মূলত তাদের টিকে থাকার কৌশলেরই অংশ।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং কংগ্রেসের ভূমিকা আগামী দিনে এই সংঘাতের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে। সামগ্রিকভাবে, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার এই পরিস্থিতি একটি জটিল ও দীর্ঘস্থায়ী সংকটের দিকে ধাবিত হচ্ছে, যার প্রভাব কেবল মধ্যপ্রাচ্য নয়, বরং বিশ্বজুড়ে অনুভূত হচ্ছে। উভয় দেশই তাদের সামরিক ও অর্থনৈতিক সক্ষমতাকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে ব্যবহারের চেষ্টা করছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
