জার্মানির লিপজিগ-হালে বিমানবন্দরে গত ৪ আগস্ট একটি ড্রোন হামলার চেষ্টা চালানো হয়েছিল বলে অভিযোগ করেছে জার্মানি। এই ঘটনার তদন্ত শেষে হামলাকারীদের সঙ্গে রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় সংস্থার সরাসরি যোগসূত্র পাওয়ার দাবি করেছে বার্লিন। এই অভিযোগের প্রেক্ষিতে মঙ্গলবার ১ সেপ্টেম্বর জার্মানি রাশিয়ার রাষ্ট্রদূতকে তলব করেছে। ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় জার্মানি বন শহরে অবস্থিত রাশিয়ার কনস্যুলেট জেনারেল এবং বার্লিনে অবস্থিত রুশ সাংস্কৃতিক কেন্দ্র রাশিয়ান হাউজ বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
এছাড়া রুশ নাগরিকদের ওপর নতুন করে ভ্রমণ বিধিনিষেধ ও নিষেধাজ্ঞা আরোপের প্রক্রিয়া শুরু করেছে জার্মান সরকার। জার্মানির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আলেকজান্ডার ডোব্রিন্ট জানিয়েছেন, পুলিশি তদন্ত, অপরাধের ধরন এবং গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে এই হামলার পেছনে রাশিয়ার দায়বদ্ধতা নিশ্চিত হওয়া গেছে। তিনি জানান, একটি ইউক্রেনীয় কার্গো বিমানের কাছে বিস্ফোরকবাহী একটি ড্রোন পাওয়া গিয়েছিল, যা পরে নিষ্ক্রিয় করা হয়।
তদন্তে দেখা গেছে, ড্রোনটি নিয়ন্ত্রণকারী ব্যক্তিরা রাশিয়ার একটি রাষ্ট্রীয় সংস্থার হয়ে কাজ করছিলেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও উল্লেখ করেন যে, এই ঘটনা ইউরোপে রাশিয়ার চলমান হাইব্রিড অভিযানের একটি অংশ। তবে জার্মানির এই অভিযোগ সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে রাশিয়া। কিরগিজস্তানের রাজধানী বিশকেকে সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার সম্মেলনে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এই অভিযোগকে বানোয়াট বলে অভিহিত করেছেন।
তিনি দাবি করেন, জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিশ ম্যার্ৎস দেশের নাগরিকদের আস্থা হারিয়েছেন এবং জনগণের সমর্থন ধরে রাখার লক্ষ্যেই তার সরকার রাশিয়ার বিরুদ্ধে এই অভিযোগ তৈরি করেছে। তিনি এই পদক্ষেপকে জার্মানির একটি বড় ভুল হিসেবে উল্লেখ করেন। রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মারিয়া জাখারোভাও জার্মানির এই সিদ্ধান্তের কঠোর জবাব দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।
এদিকে জার্মানির এই অবস্থানের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ন্যাটো। ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লাইয়েন জানিয়েছেন, রুশ আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ইউরোপ ঐক্যবদ্ধ এবং রাশিয়ার বিরুদ্ধে অতিরিক্ত নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের পরবর্তী বৈঠকে চূড়ান্ত করা হবে। এর আগে গত জুলাই মাসেও ইউরোপীয় ইউনিয়ন রাশিয়ার সামরিক কর্মকর্তা, হ্যাকার এবং বেশ কয়েকটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল।
ন্যাটোর মহাসচিব মার্ক রুটে জার্মানির এই পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়েছেন। তিনি দাবি করেন, হামলার পেছনে রাশিয়ার দায়বদ্ধতার প্রমাণ অত্যন্ত স্পষ্ট। সাম্প্রতিক সময়ে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে রুশ গুপ্তচরবৃত্তি এবং নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। এর আগে ইউরোপের কয়েকটি দেশ তাদের ভূখণ্ডে ঘটা বিভিন্ন নাশকতা ও হামলার চেষ্টার জন্য মস্কোকে দায়ী করেছে।
জার্মানির এই নতুন পদক্ষেপের ফলে দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কে বড় ধরনের টানাপোড়েন সৃষ্টি হয়েছে। লিপজিগ-হালে বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে এবং ঘটনার পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। জার্মানি সরকার জানিয়েছে, তারা রাশিয়ার বিরুদ্ধে আরও কঠোর পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত। অন্যদিকে রাশিয়াও পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি দিয়ে রেখেছে।
পুরো বিষয়টি এখন আন্তর্জাতিক মহলে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। ইউরোপীয় দেশগুলো রাশিয়ার বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ অবস্থান নেওয়ার কথা পুনর্ব্যক্ত করেছে, যা ভবিষ্যতে আরও বড় কোনো কূটনৈতিক সংকটের ইঙ্গিত দিচ্ছে। জার্মানির গোয়েন্দা সংস্থাগুলো এই ঘটনার বিস্তারিত তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে এবং প্রাপ্ত তথ্যগুলো নিয়মিতভাবে মিত্র দেশগুলোর সঙ্গে শেয়ার করা হচ্ছে।
