ঘানার বৃহত্তর আক্রা অঞ্চলের গা জনগোষ্ঠীর মধ্যে মৃত ব্যক্তির শেষযাত্রার জন্য বিশেষ আকৃতির কফিন তৈরির এক অনন্য ঐতিহ্য প্রচলিত রয়েছে। স্থানীয়ভাবে এই কফিনগুলোকে ‘আবেবুউ আদেকাই’ বা ‘প্রবাদ বাক্স’ বলা হয়। এই প্রথা অনুযায়ী, সাধারণ আয়তাকার কফিনের পরিবর্তে মৃত ব্যক্তির পেশা, শখ কিংবা ব্যক্তিত্বের সঙ্গে মিল রেখে বিভিন্ন প্রাণী, বস্তু বা যানবাহনের আকৃতিতে কফিন তৈরি করা হয়।
একজন জেলে মারা গেলে তার জন্য মাছ বা কাঁকড়ার আকৃতির কফিন তৈরি করা হয়। আবার কোনো ফুটবল খেলোয়াড়ের জন্য ফুটবলের আকৃতি, ব্যবসায়ীর জন্য তার ব্যবসার সঙ্গে সম্পর্কিত কোনো বস্তু কিংবা পাইলটের জন্য উড়োজাহাজের আকৃতির কফিন তৈরি করা হয়। এই বিশেষ ধরনের কফিন তৈরির কারিগর এরিক অ্যাডোটে কপাকপো, যিনি ‘এরিকো’ নামে পরিচিত, জানান যে তিনি বহু বছর ধরে এই শিল্পের সঙ্গে জড়িত।
৪৯ বছর বয়সী এরিক জানান, প্রতিটি কফিন হাতে তৈরি করতে কয়েক সপ্তাহ সময় লাগে। কাঠ কাটা, আকৃতি দেওয়া, বিভিন্ন অংশ জোড়া লাগানো এবং রং করার মাধ্যমে কফিনটি শেষযাত্রার জন্য প্রস্তুত করা হয়। ঘানার অনেক মানুষের কাছে অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া শুধু শোক প্রকাশের মাধ্যম নয়, বরং এটি মৃত ব্যক্তির জীবনের অর্জন, পরিচয় ও স্মৃতিকে উদ্যাপনের একটি বিশেষ সুযোগ।
অভিনব কফিনের মাধ্যমে মৃত ব্যক্তির জীবনের গল্পটিই যেন শেষবারের মতো তুলে ধরা হয়। তিনি কী করতেন, কী ভালোবাসতেন বা কীভাবে জীবন কাটিয়েছেন—কফিনের আকৃতির মধ্য দিয়ে তার একটি প্রতীকী প্রকাশ ঘটে। বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে আক্রা অঞ্চলে এই ঐতিহ্যের সূচনা হয়। এরপর প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে কারিগরদের নিপুণ হাতের ছোঁয়ায় এটি একটি বিশেষ ধরনের শিল্পে পরিণত হয়েছে।
বর্তমানে এই কফিনগুলো শুধু ঘানার গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নেই, বরং আন্তর্জাতিক পর্যায়েও পরিচিতি পেয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন জাদুঘর ও প্রদর্শনীতে এসব কফিন সমকালীন আফ্রিকান কারুশিল্পের অনন্য উদাহরণ হিসেবে স্থান পেয়েছে। তবে এরিকোর মতো কারিগরদের কাছে এটি কেবল শিল্পকর্ম নয়। প্রতিটি কফিনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে একটি পরিবারের গভীর আবেগ ও প্রিয়জনকে শেষবারের মতো স্মরণ করার গল্প।
এরিকোর মতে, কাঁকড়া, মাছ, জুতা কিংবা উড়োজাহাজ—যে আকৃতির কফিনই তৈরি করা হোক না কেন, তার মূল উদ্দেশ্য একটাই। তা হলো মৃত ব্যক্তির পরিচয় ও জীবনের গল্পকে শেষ বিদায়ের অংশ করে তোলা। এভাবেই ঘানার এই বিশেষ কফিন মৃত্যুর প্রতীক হওয়ার পাশাপাশি হয়ে উঠেছে একটি মানুষের বেঁচে থাকার গল্প ও স্মৃতির স্থায়ী প্রতিচ্ছবি।
প্রতিটি কফিন তৈরির সময় কারিগররা অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে কাজ করেন যাতে মৃত ব্যক্তির জীবনের মূল বৈশিষ্ট্যগুলো ফুটে ওঠে। এই প্রথাটি ঘানার সংস্কৃতির একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা মৃত্যুর পরবর্তী সময়েও মানুষের জীবনকে সম্মান জানানোর এক অনন্য উপায় হিসেবে বিবেচিত হয়। এই শিল্পকর্মগুলো কেবল কাঠের তৈরি বাক্স নয়, বরং এগুলো মৃত ব্যক্তির জীবনের একটি জীবন্ত দলিল হিসেবে কাজ করে।
