গ্রিস ও ইসরায়েল তাদের ভূখণ্ড সুরক্ষায় একটি সমন্বিত ও বহুস্তরীয় প্রতিরক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্যে ৩৫০ কোটি ডলারের একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি সই করেছে। গত ৩১ আগস্ট তেলআবিবে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আমির বারাম এবং গ্রিসের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালক আইওয়ানিস বুরাস এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। ‘অ্যাকিলিস শিল্ড’ নামে পরিচিত এই প্রতিরক্ষা প্যাকেজের আওতায় ডেভিড’স স্লিং ও স্পাইডার ইন্টারসেপ্টর, বারাক আকাশ ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা এবং বহুমুখী রাডার অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
এছাড়া কৌশলগত স্থাপনাগুলোকে ড্রোন বা ইউএভির আক্রমণ থেকে সুরক্ষায় ড্রোন ডোমব্যবস্থা যুক্ত করার জন্য দুই দেশ আলাদা একটি চুক্তিতেও উপনীত হয়েছে। এটি দুই দেশের মধ্যে এখন পর্যন্ত স্বাক্ষরিত সবচেয়ে বড় প্রতিরক্ষা চুক্তি এবং ইসরায়েলের সাম্প্রতিক ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামরিক সরঞ্জাম রপ্তানি চুক্তি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইসরায়েলের ভাবমূর্তি নিয়ে বিভিন্ন মহলে বিতর্ক থাকলেও গ্রিসের সঙ্গে এই সামরিক সম্পর্ক গভীর করার সিদ্ধান্তটি ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার ওপর ভিত্তি করে নেওয়া হয়েছে। এই চুক্তির পেছনে অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে ইরানের সঙ্গে ইসরায়েলের চলমান সংঘাতের প্রভাবকে দেখা হচ্ছে। ২০২৪ সাল থেকে সাইপ্রাসসহ প্রতিবেশী দেশগুলোতে ড্রোন হামলার ঘটনা উদ্বেগ বাড়িয়ে দিয়েছে।
গ্রিসের প্রতিরক্ষামন্ত্রী নিকোস দেনদিয়াস এথেন্সের নিজস্ব ড্রোনবিরোধী ডোম ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। এছাড়া সৌদি আরব, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো দেশগুলোও ড্রোন হুমকি মোকাবিলায় সামরিক প্রযুক্তি সংগ্রহের দিকে ঝুঁকছে। ইসরায়েলের দীর্ঘদিনের কৌশলগত নীতি ‘পেরিফেরি ডকট্রিন’ এই সম্পর্কের মূলে রয়েছে। এই নীতির লক্ষ্য হলো আরব দেশগুলোর বাইরে লেভান্ট অঞ্চলের অ-আরব রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলা।
গ্রিসের ক্ষেত্রে তুরস্ককে একটি অভিন্ন হুমকি হিসেবে বিবেচনা করা হয়, যা দুই দেশের মধ্যে কৌশলগত অংশীদারত্বকে ত্বরান্বিত করেছে। ঐতিহাসিকভাবে তুরস্ক ইসরায়েলের ঘনিষ্ঠ অংশীদার থাকলেও ২০০৮ সালে গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলি সামরিক অভিযানের পর থেকে দুই দেশের সম্পর্কে ফাটল ধরে। ২০২৪ সালে তুরস্ক ইসরায়েলের ওপর বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক কার্যত ভেঙে পড়ে।
এই শূন্যস্থান পূরণে গ্রিস দ্রুত ইসরায়েলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়িয়েছে। ২০২৫ সালের শেষ দিকে ইসরায়েল, সাইপ্রাস ও গ্রিস একটি যৌথ কর্মপরিকল্পনা সই করে, যা সামরিক সহযোগিতাকে আরও বিস্তৃত করেছে। জ্বালানি সহযোগিতাও এই সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। পূর্ব ভূমধ্যসাগরে গ্যাস মজুত আবিষ্কারের পর থেকে পাইপলাইন ও সামুদ্রিক নিরাপত্তা নিয়ে তিন দেশ নিয়মিত কাজ করছে।
এর ফলে পর্যটন ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও গতি এসেছে। ২০২৫ সালে প্রায় ৭ লাখ ৪৪ হাজার ইসরায়েলি নাগরিক গ্রিস ভ্রমণ করেছেন। আঞ্চলিক রাজনীতিতে নতুন নতুন জোট গঠনের প্রবণতাও এই সম্পর্কের বিকাশে ভূমিকা রাখছে। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ভারত, গ্রিস, সাইপ্রাস এবং কয়েকটি আরব ও আফ্রিকান দেশকে নিয়ে একটি হেক্সাগন অ্যালায়েন্সের প্রস্তাব দিয়েছেন।
অন্যদিকে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান মিলে মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি সই করেছে। এই পরিবর্তনশীল ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতিতে নিরাপত্তার গ্যারান্টিদাতা হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর আস্থার সংকট বিভিন্ন দেশের মধ্যে স্পষ্ট হয়ে উঠছে। যদিও গ্রিসের সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে ইসরায়েলবিরোধী জনমত বিদ্যমান, তবুও রাষ্ট্র পর্যায়ে নিরাপত্তা সহযোগিতা অব্যাহত রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইসরায়েলের নীতির বিরুদ্ধে জনমত থাকলেও সামরিক অভিজ্ঞতা ও প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির চাহিদার কারণে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে ইসরায়েলের নিরাপত্তা সম্পর্ক গভীর হচ্ছে। এই চুক্তিটি মূলত ইসরায়েলের পুরোনো কৌশলগত নীতিরই একটি নতুন প্রকাশ, যা বর্তমান বৈশ্বিক অস্থিরতার মধ্যে আরও ত্বরান্বিত হয়েছে।
