ইয়েমেনের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকার-সমর্থিত বাহিনীর সঙ্গে ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীদের তীব্র সংঘর্ষে অন্তত ১৪১ জন যোদ্ধা নিহত হয়েছেন। শনিবার ৫ সেপ্টেম্বর থেকে রোববার ভোর পর্যন্ত সময়ের মধ্যে এই প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীর দুই সামরিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, শনিবার দুপুর থেকে রোববার ভোর পর্যন্ত সরকারি বাহিনীর অন্তত ৮৪ জন সৈন্য নিহত হয়েছেন।
তাদের মধ্যে অধিকাংশ সৈন্য রকেট হামলায় প্রাণ হারিয়েছেন। অন্যদিকে, হুথিদের চারটি সূত্র নিশ্চিত করেছে যে, একই সময়ের ব্যবধানে তাদের ৫৭ জন বিদ্রোহী যোদ্ধা নিহত হয়েছেন। ইয়েমেনের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের একাধিক ফ্রন্টে, বিশেষ করে তায়েজ ও হোদাইদা প্রদেশ এবং লোহিত সাগর উপকূলীয় এলাকায় লড়াইয়ের তীব্রতা হঠাৎ করে বৃদ্ধি পাওয়ায় প্রাণহানির এই সংখ্যা দাঁড়িয়েছে।
সরকারি বাহিনীর পক্ষ থেকে রোববার প্রকাশিত এক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে যে, হোদাইদার দক্ষিণে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হাইস জেলার নিয়ন্ত্রণ বিদ্রোহীদের কাছ থেকে পুনরুদ্ধার করা হয়েছে। এই জেলাটি হোদাইদা, তায়েজ ও ইব্ব প্রদেশকে সংযোগকারী প্রধান সড়কের অত্যন্ত কাছাকাছি অবস্থিত। এছাড়া সরকারি বাহিনী পার্শ্ববর্তী আল-জারাহি জেলাতেও পাল্টা হামলা চালিয়েছে এবং ডজনখানেক হুথি যোদ্ধাকে বন্দি করার দাবি করেছে।
তায়েজ ও লাহজ প্রদেশের আশপাশের এলাকাগুলোতেও লড়াই ও হামলার খবর পাওয়া গেছে। ইয়েমেনের সামরিক বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, তায়েজ ও হোদাইদায় হুথিদের অবস্থান, সামরিক যানবাহন ও জনসমাগম লক্ষ্য করে শুক্রবার ৪ সেপ্টেম্বর অন্তত ১৫ বার বিমান হামলা চালিয়েছে সরকারি বাহিনী। লোহিত সাগরকে এডেন উপসাগরের সঙ্গে যুক্ত করা কৌশলগত সমুদ্রপথ এবং বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জাহাজ চলাচলের রুট বাব-এল-মানদেব প্রণালির দিকে হুথিরা বড় ধরনের অভিযান চালানোর পরপরই সরকারি বাহিনী এই বিমান হামলাগুলো পরিচালনা করে।
২০২২ সালে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় একটি অস্ত্রবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে ইয়েমেনের সংঘাত পরিস্থিতি তুলনামূলকভাবে শান্ত ছিল। যদিও সেই আনুষ্ঠানিক যুদ্ধবিরতির মেয়াদ ওই বছরের শেষের দিকে শেষ হয়ে যায়, তবুও চুক্তির প্রভাবে গত কয়েক বছর দেশজুড়ে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ দেখা যায়নি। কিন্তু গত কয়েক সপ্তাহে দেশটির কয়েকটি প্রদেশে নতুন করে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ায় সেই আপেক্ষিক শান্ত পরিস্থিতি ভেঙে পড়েছে।
চলমান এই সংঘাতের ফলে সাধারণ বেসামরিক নাগরিকরাও ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন এবং বাস্তুচ্যুত হচ্ছেন। জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা বিষয়ক সমন্বয়কারী দপ্তর জানিয়েছে, তায়েজে সংঘাত বৃদ্ধি পাওয়ার পর গত দুই দিনে প্রায় ১ হাজার ৮০০ পরিবার তাদের ঘরবাড়ি ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে। ২০১৪ সালে ইরান সমর্থিত হুথিরা রাজধানী সানা দখল করে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে সেখান থেকে বিতাড়িত করার পর ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধ শুরু হয়।
এর পরের বছর সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট হুথিদের বিরুদ্ধে সামরিক হস্তক্ষেপ শুরু করে। হুথিরা বর্তমানে সানা এবং ইয়েমেনের উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলের বড় একটি অংশ নিয়ন্ত্রণ করছে। অন্যদিকে, আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকার এবং তাদের মিত্র গোষ্ঠীগুলো দক্ষিণ ও পূর্বাঞ্চলের অধিকাংশ এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছে। দীর্ঘদিনের এই গৃহযুদ্ধ ইয়েমেনের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে এবং চলমান এই নতুন সংঘর্ষ দেশটিতে মানবিক সংকটকে আরও গভীর করে তুলছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
