চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া ইরান-মার্কিন যুদ্ধ ছয় মাস পূর্ণ হয়েছে। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মতে, এই সংঘাতের পর ইরান আরও আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠেছে এবং ওয়াশিংটনের সঙ্গে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় সামরিক ও অর্থনৈতিক সক্ষমতা অর্জন করেছে।
প্রথম দফায় ৪০ দিন সম্মুখ যুদ্ধের পর ১৮ জুন সমঝোতা হলেও পরবর্তীতে যুদ্ধবিরতি ভেঙে পুনরায় সংঘর্ষে জড়ায় দুই পক্ষ। বর্তমানে সম্মুখ যুদ্ধের তীব্রতা কমলেও যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে অর্থনৈতিকভাবে একঘরে করার জন্য ‘অপারেশন ইকনোমিক আউটকাস্ট’ জারি করেছে। তবে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন যে, বর্তমান প্রেক্ষাপটে ইরান-মার্কিন সংঘাতকে প্রকৃত অর্থে যুদ্ধ হিসেবে গণ্য করা যায় না।
মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর বর্তমান মূল্যায়ন যুদ্ধের শুরুতে করা ধারণার তুলনায় অনেক বেশি পরিবর্তিত হয়েছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যুদ্ধের শুরুতে দ্রুত বিজয় এবং সংঘাতের দ্রুত সমাপ্তির পূর্বাভাস দিয়েছিলেন। তবে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মতে, ইরান এখন নিজেদের সক্ষমতা এবং যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চাপ সৃষ্টি করার উপায়গুলো সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা পেয়েছে।
তেহরান এখন মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন স্থানে হামলা চালানোর সক্ষমতা নিয়ে অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী এবং ওয়াশিংটনকে কোনো ছাড় দেওয়ার কথা ভাবছে না।
হাউস ইন্টেলিজেন্স কমিটির ডেমোক্র্যাট সদস্য প্রতিনিধি জেসন ক্রো জানিয়েছেন, ইরানিরা তাদের বর্তমান অবস্থান নিয়ে অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসী। তিনি বলেন, তেহরান একটি দীর্ঘমেয়াদি কৌশল গ্রহণ করেছে এবং যুদ্ধের ফলে হওয়া ক্ষয়ক্ষতি তাদের পূর্বপরিকল্পনায় ছিল। তার মতে, ইরানের কাছে এখনও প্রচুর পরিমাণে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন রয়েছে এবং যুদ্ধের সময় দেশটির নেতৃত্ব আরও ঐক্যবদ্ধ হয়েছে।
এই সংঘাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো হরমুজ প্রণালির কৌশলগত গুরুত্ব। যুদ্ধের আগে এই জলপথ দিয়ে বিশ্বব্যাপী তেল বাণিজ্যের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হতো। মার্কিন কর্মকর্তারা মনে করছেন, ইরান এখন আরও স্পষ্টভাবে বুঝতে পেরেছে যে এই প্রণালির নিয়ন্ত্রণ তাদের জন্য কতটা বড় অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রভাব তৈরি করতে পারে।
ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট দাবি করেছেন যে, উপসাগরীয় দেশগুলো বিকল্প পাইপলাইন ব্যবস্থা গড়ে তুললে দুই বছরের মধ্যে হরমুজ প্রণালির গুরুত্ব কমে যাবে। তবে বর্তমানে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৯৫ ডলারের ওপরে রয়েছে এবং হরমুজ প্রণালিতে বাধার কারণে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি পেয়েছে।
গোয়েন্দা তথ্য সম্পর্কে অবহিত কর্মকর্তাদের মতে, ইরানের আত্মবিশ্বাস কেবল তাদের সামরিক সক্ষমতার ওপর নির্ভর করছে না। তেহরান মনে করছে ওয়াশিংটনের গোলাবারুদ মজুত কমে যাওয়ায় যুক্তরাষ্ট্র আরেকটি বড় আকারের হামলা চালানোর ক্ষেত্রে অনীহা দেখাবে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের আর্থিক চাপ প্রয়োগের কৌশলকে গুরুত্ব না দিয়ে ইরান প্রতিপক্ষের ওপর চাপ সৃষ্টি করার হিসাব করছে।
আগামী ৩ নভেম্বর অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনকে ইরান একটি কৌশলগত সুযোগ হিসেবে দেখছে। বর্তমান ও সাবেক কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, যে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ এবং জ্বালানির দাম বৃদ্ধি ট্রাম্প ও রিপাবলিকানদের জন্য রাজনৈতিকভাবে ক্ষতিকর হবে। হাউস ইন্টেলিজেন্স কমিটির ডেমোক্র্যাট সদস্য প্রতিনিধি জোশ গটহাইমার জানিয়েছেন, ইরানিরা মনে করছে তাদের হাতে সর্বোচ্চ প্রভাব বিস্তারের সুযোগ রয়েছে এবং তারা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে প্রেসিডেন্টকে আরও চাপে রাখার পরিকল্পনা করছে।
প্রচলিত যুদ্ধক্ষেত্রের বাইরে সাইবার যুদ্ধের ক্ষেত্রেও ইরান সক্রিয় রয়েছে। মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, জুলাইয়ের শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্রের ১০০টির বেশি পানি সরবরাহ ব্যবস্থার হামলার পেছনে ইরান-সংশ্লিষ্ট হ্যাকারদের হাত রয়েছে। এই হামলার ফলে পানীয় জল অনিরাপদ না হলেও সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটেছিল। এছাড়া ইরান-সংশ্লিষ্ট হ্যাকাররা যুক্তরাষ্ট্রের তেল ও গ্যাস অবকাঠামোতে সাইবার হামলার আগ্রহ দেখিয়েছে, তবে তারা সফলভাবে প্রবেশ করতে পেরেছে কি না তা এখনও স্পষ্ট নয়।
একটি রয়টার্স/ইপসোস জরিপে দেখা গেছে, মাত্র ২৫ শতাংশ আমেরিকান মনে করেন যে যুদ্ধের খরচের তুলনায় এর সুফল যথেষ্ট। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে যুদ্ধবিরোধী মনোভাব বৃদ্ধি পেয়েছে।
