ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় সিরিক এলাকায় একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় শিশুসহ পাঁচজন নিহত হয়েছেন। এই ঘটনায় আরও ৫০ জনের বেশি মানুষ আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে ইরানের রেড ক্রিসেন্ট। মঙ্গলবার শুরু হওয়া এই মার্কিন হামলার জবাবে ইরান জর্ডান, কুয়েত, ইরাক এবং বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন লক্ষ্যবস্তুতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে।
ইরানের রেড ক্রিসেন্টের তথ্য অনুযায়ী, সিরিকে একটি বাড়িতে বিয়ের অনুষ্ঠান চলাকালে মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে এই হতাহতের ঘটনা ঘটে। মার্কিন সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, তারা এই প্রতিবেদনের বিষয়ে অবগত আছে, তবে তারা কখনোই বেসামরিক নাগরিকদের লক্ষ্যবস্তু করে না। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের দাবি, হরমুজ প্রণালীতে বাণিজ্যিক জাহাজ এবং ওই অঞ্চলে মার্কিন বাহিনীর ওপর ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) সাম্প্রতিক হামলার প্রতিক্রিয়ায় এই পাল্টা পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
মার্কিন নৌবাহিনীর ক্যাপ্টেন টিম হকিন্স জানিয়েছেন, মার্কিন সামরিক বাহিনী আইআরজিসির মতো বেসামরিক নাগরিকদের লক্ষ্য করে হামলা চালায় না। এদিকে, সিরিকে হামলার প্রতিশোধ নিতে ইরান বুধবার ভোরে জর্ডানের আকাবায় অবস্থিত মার্কিন মেরিন ঘাঁটিতে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে। জর্ডানের সশস্ত্র বাহিনী জানিয়েছে, তারা ১৩টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করেছে, যার মধ্যে ১০টি ধ্বংস করা হয়েছে এবং তিনটি জনশূন্য এলাকায় পড়েছে।
এই ঘটনায় কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। একই সময়ে কুয়েতের সেনাবাহিনী জানিয়েছে, তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার জবাব দিচ্ছে। বাহরাইনেও বেশ কয়েকটি বিস্ফোরণের খবর পাওয়া গেছে। ইরাকের স্বায়ত্তশাসিত কুর্দিস্তান অঞ্চলে মার্কিন ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালানোর কথা স্বীকার করেছে ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ড।
এতে একটি রক্ষণাবেক্ষণ কেন্দ্র, গুদাম এবং সরঞ্জাম ধ্বংস হয়েছে বলে জানানো হয়েছে। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্যমতে, চাবাহার, কোনারাক এবং জিরোফটের একটি বিমানবন্দরে ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে। এছাড়া কেশম দ্বীপ এবং বন্দর আব্বাসেও বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মঙ্গলবার বিকেলে হামলার ঘোষণা দিয়ে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন, ইরান যদি পাল্টা হামলা চালায় তবে তাদের আরও কঠোর ও উচ্চতর মাত্রার হামলার মুখে পড়তে হবে।
এই সংঘাতের প্রেক্ষাপটে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, মঙ্গলবার দুপুর ১২টা থেকে বুধবার ভোর পর্যন্ত আইআরজিসির লক্ষ্যবস্তুতে এই অভিযান চালানো হয়েছে। চলতি বছরের জুন মাসে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছিল, যার মাধ্যমে যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানো হয়েছিল। তবে সেই চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর নতুন করে সংঘাত শুরু হয়েছে।
উভয় দেশই হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচলের ক্ষেত্রে একে অপরের ওপর আক্রমণ চালিয়েছে। ইরান তাদের অনুমতি ছাড়া প্রণালী অতিক্রমকারী জাহাজগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করছে এবং যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলোতে নৌ-অবরোধ আরোপ করেছে। গত ২৪ আগস্ট ওয়াশিংটন ইরানের ওপর নতুন করে নিষেধাজ্ঞা আরোপের ঘোষণা দেয়। মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট জি-২০ অর্থমন্ত্রীদের বৈঠকে দাবি করেছেন, অনেক মার্কিন মিত্র দেশ ইরানের ওপর এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করতে সহায়তা করবে।
তবে ইরানি কর্মকর্তারা এই নিষেধাজ্ঞাকে অর্থনৈতিক চাপ হিসেবে অভিহিত করে তা প্রত্যাখ্যান করেছেন। ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি পুনরায় চুক্তির শর্ত মেনে চলে, তবে ইরানও ইতিবাচক সাড়া দেবে। এর আগে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের ওপর ব্যাপক হামলা চালিয়েছিল, যার জবাবে ইরান ইসরায়েল ও মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা চালায় এবং হরমুজ প্রণালী দিয়ে নৌ চলাচল কার্যত বন্ধ করে দিয়েছিল।
বর্তমান পরিস্থিতিতে দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে।
