ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় সিরিক কাউন্টিতে একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় এক শিশুসহ মোট পাঁচজন নিহত হয়েছেন। এই হামলায় আরও ৬৩ জন আহত হয়েছেন বলে নিশ্চিত করেছেন স্থানীয় কর্মকর্তারা। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই জানিয়েছেন, বুধবার ভোরে কুহেস্তাক শহরের একটি বাড়িতে এই হামলা চালানো হয়। হামলার সময় সেখানে বিয়ের অনুষ্ঠান চলছিল।
সিরিক কাউন্টির গভর্নর রেজা শহিদিয়ান রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যমকে জানিয়েছেন, হতাহতদের মধ্যে ৫০ জনই নারী ও শিশু। আহতদের চিকিৎসার জন্য মিনাব শহরের একটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে এবং তাদের শারীরিক অবস্থা বর্তমানে স্থিতিশীল রয়েছে। হামলার প্রত্যক্ষদর্শী এক শিশু জানিয়েছে, অনুষ্ঠানস্থলে পৌঁছানোর আগেই সে আকাশে যুদ্ধবিমান উড়তে দেখেছিল।
এরপরই ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটে এবং চারপাশ থেকে ইট, পাথর ও সিমেন্টের টুকরা ছিটকে এসে অনেকের গায়ে লাগে। কুহেস্তাক ছাড়াও ইরানের দক্ষিণাঞ্চলের কোনারাক, বন্দর আব্বাস ও কেশম দ্বীপে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে বলে তথ্য পাওয়া গেছে। এই হামলার প্রতিক্রিয়ায় ইরানের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, তারা পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে জর্ডান, বাহরাইন ও ইরাকে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি ও স্থাপনায় আঘাত করেছে।
কুয়েতের পক্ষ থেকেও জানানো হয়েছে যে, তারা আকাশসীমায় কয়েকটি ড্রোন প্রতিহত করেছে। মার্কিন সামরিক বাহিনী এই হামলার দায় স্বীকার করে দাবি করেছে, হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার চেষ্টার প্রতিক্রিয়ায় তারা ইরানের সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ভাষ্যমতে, তারা ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা, রাডার, সমুদ্রপথে ব্যবহৃত সামরিক সরঞ্জাম, মাইন পেতে রাখার সক্ষমতা এবং যোগাযোগ স্থাপনা লক্ষ্য করে এই অভিযান চালিয়েছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর থেকেই হরমুজ প্রণালি অবরোধ করে রেখেছে ইরান। এর আগে যুদ্ধের শুরুর দিকে মিনাব শহরের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মার্কিন হামলায় ১৫০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছিলেন এবং লামার্দ শহরের একটি ক্রীড়া কমপ্লেক্সে হামলায় অন্তত ২১ জন প্রাণ হারিয়েছিলেন।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই এই হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেছেন, এটি ধারাবাহিক নৃশংসতারই একটি অংশ। তিনি এই হামলার উপযুক্ত জবাব দেওয়ার হুমকি দিয়েছেন। দুই দেশের মধ্যে চলমান এই উত্তেজনার ফলে মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে পড়েছে। গত সপ্তাহের শেষভাগ থেকেই উভয় পক্ষের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনা ঘটছে।
হরমুজ প্রণালি নিয়ে দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা এবং সাম্প্রতিক সামরিক সংঘাতের কারণে ওই অঞ্চলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা চরম ঝুঁকির মুখে পড়েছে। মার্কিন বাহিনী জানিয়েছে, তারা ইরানের সামরিক সক্ষমতা কমিয়ে আনার লক্ষ্যে তাদের অভিযান অব্যাহত রাখবে। অন্যদিকে, ইরান সরকার তাদের সার্বভৌমত্ব রক্ষার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে। বর্তমানে পুরো অঞ্চলে এক ধরনের অস্থিরতা বিরাজ করছে এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এই সংঘাতের দিকে নজর রাখছে।
স্থানীয় প্রশাসন ও উদ্ধারকর্মীরা ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। আহতদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সহায়তা প্রদানের জন্য স্থানীয় হাসপাতালগুলোকে প্রস্তুত রাখা হয়েছে। হামলার শিকার সাধারণ বেসামরিক নাগরিকদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে ইরান সরকার বিভিন্ন এলাকায় অতিরিক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করেছে। এই ঘটনার পর থেকে হরমুজ প্রণালি ও এর আশেপাশের এলাকায় সামরিক তৎপরতা বৃদ্ধি পেয়েছে।
উভয় পক্ষই তাদের সামরিক অবস্থান শক্তিশালী করার ঘোষণা দিয়েছে। তবে কোনো পক্ষই এখন পর্যন্ত আলোচনার মাধ্যমে সংকট সমাধানের কোনো ইঙ্গিত দেয়নি। এই সংঘাতের ফলে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বড় ধরনের হুমকির মুখে পড়েছে বলে পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন।
