যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন করার লক্ষ্যে অপারেশন ইকোনমিক আউটকাস্ট নামক একটি কার্যক্রম শুরু করেছে। এই কার্যক্রমের অংশ হিসেবে ইরানের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগ তুলে বেশ কিছু চীনা কোম্পানি এবং ব্যবসায়িক নাগরিকদের ওপর নতুন করে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে মার্কিন প্রশাসন। এই সিদ্ধান্তের প্রতিক্রিয়ায় বেইজিং কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছে এবং মার্কিন এই পদক্ষেপকে একতরফা ও আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী হিসেবে আখ্যায়িত করেছে।
বৃহস্পতিবার ৩ সেপ্টেম্বর চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র হুয়াং লিং এক বিবৃতিতে জানান যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই নিষেধাজ্ঞা আন্তর্জাতিক আইনের কোনো ভিত্তি নেই এবং এর পেছনে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের কোনো অনুমোদনও নেই। বেইজিংয়ের পক্ষ থেকে অবিলম্বে এই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবি জানানো হয়েছে। চীনের দাবি, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই একতরফা পদক্ষেপ কেবল চীন ও ইরানের মধ্যকার স্বাভাবিক অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ককেই ক্ষতিগ্রস্ত করছে না, বরং এটি বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তা এবং সরবরাহ ব্যবস্থার স্থিতিশীলতার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র আরও স্পষ্ট করে বলেছেন যে, বেইজিং তার দেশের নাগরিক এবং কোম্পানিগুলোর বৈধ অধিকার ও স্বার্থ রক্ষায় সব ধরনের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ অব্যাহত রাখবে। এদিকে শুক্রবার ৪ সেপ্টেম্বর চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র গুয়ো জিয়াকুন মার্কিন-চীন দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বিষয়ে মন্তব্য করেছেন। তিনি জানান, চীন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপ্রধানদের মধ্যে অতীতে যে গুরুত্বপূর্ণ সমঝোতাগুলো হয়েছিল, তা যৌথভাবে বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, দুই দেশের অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্কের স্থিতিশীলতা বজায় রাখা উভয় পক্ষের জন্যই জরুরি। মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ারের মন্তব্যের প্রেক্ষিতে তিনি এই বক্তব্য প্রদান করেন। এর আগে বৃহস্পতিবার জেমিসন গ্রিয়ার মার্কিন-চীন সম্পর্কের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেছিলেন। বিগত কয়েক মাস ধরেই ইরান-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্র ধারাবাহিকভাবে চীনা কোম্পানি ও ব্যক্তিদের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়ে আসছে।
মার্কিন প্রশাসনের অভিযোগের তালিকায় রয়েছে ইরানের অস্ত্রব্যবস্থা ও স্যাটেলাইট ছবি সরবরাহের মতো বিষয়। এছাড়া চীনের বাজারে ইরানি তেল বিক্রি ও পরিবহনে মধ্যস্থতা করার অভিযোগও আনা হয়েছে চীনা কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে। ইরানকে অর্থনৈতিকভাবে চাপে ফেলার এই মার্কিন কৌশল আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন করে উত্তেজনার সৃষ্টি করেছে। বেইজিংয়ের পক্ষ থেকে বারবার বলা হচ্ছে যে, এ ধরনের নিষেধাজ্ঞা বৈশ্বিক বাণিজ্যের স্বাভাবিক গতিপ্রকৃতিকে বাধাগ্রস্ত করছে।
চীন মনে করে, কোনো দেশের ওপর একতরফা নিষেধাজ্ঞা চাপিয়ে দেওয়া আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি অগ্রহণযোগ্য চর্চা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপের ফলে চীন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার বাণিজ্যিক সম্পর্কে টানাপোড়েন আরও বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে বেইজিং এখন পর্যন্ত আলোচনার মাধ্যমে বিষয়টি সমাধানের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে।
চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্রের বক্তব্য থেকে এটি স্পষ্ট যে, তারা দুই দেশের মধ্যকার অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষার পক্ষে। অন্যদিকে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাদের অপারেশন ইকোনমিক আউটকাস্টের মাধ্যমে ইরানকে একঘরে করার নীতিতে অটল রয়েছে। এই নীতি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে চীনা কোম্পানিগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করাকে একটি বড় কৌশলগত পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহ এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ওপর এই নিষেধাজ্ঞার প্রভাব নিয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনা চলছে। চীন তার অবস্থান পরিষ্কার করে জানিয়েছে যে, তারা আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল এবং অন্য কোনো দেশের একতরফা সিদ্ধান্ত মেনে নিতে বাধ্য নয়। বেইজিংয়ের এই কঠোর বার্তা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইরান নীতি এবং চীন-মার্কিন সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন সমীকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
