পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান এবং তার স্ত্রী বুশরা বিবিকে আর একাকী কারাবন্দি রাখা যাবে না বলে নির্দেশ দিয়েছে ইসলামাবাদ হাইকোর্ট। আদালতের এই রায়ে আদিয়ালা কারা কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যেন তারা কারাগারের আইন অনুযায়ী এই দুজনের মধ্যে সাক্ষাতের ব্যবস্থা করে। বর্তমানে রাওয়ালপিন্ডির আদিয়ালা কারাগারে বন্দি থাকা ইমরান খান এবং বুশরা বিবি দুর্নীতি ও সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মামলায় দীর্ঘ মেয়াদের কারাদণ্ড ভোগ করছেন।
ইমরান খানের বোন আলিমা খান এবং বুশরা বিবির মেয়ে মুবাশারা খাওয়ার মানেকা পৃথকভাবে আদালতের দ্বারস্থ হয়েছিলেন। আলিমা খান তার ভাইয়ের একাকী কারাবন্দি থাকার অভিযোগ করে আবেদন করেছিলেন এবং মুবাশারা খাওয়ার মানেকা তার মায়ের জন্য আবেদন জানিয়েছিলেন। এই আবেদনের প্রেক্ষিতে বিচারপতি খাদিম হুসেইন সোমরো রায়ে ঘোষণা করেন যে, কারাগারের নিয়ম অনুযায়ী ইমরান খানের পরিবারের সদস্যদের তার সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ দিতে হবে।
একই সঙ্গে ইমরান খানের দুই ছেলের সঙ্গে তার টেলিফোনে কথা বলার ব্যবস্থাও করতে বলা হয়েছে।
আদালত আরও নির্দেশ দিয়েছে যে, আদিয়ালা কারা কর্তৃপক্ষকে প্রতিদিন ইমরান খানকে সংবাদপত্র ও বই পড়তে দেওয়ার সুযোগ দিতে হবে। পাশাপাশি কারাগারের নিয়ম অনুযায়ী তার প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে। আদালতের এই নির্দেশগুলো বাস্তবায়ন করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে আদিয়ালা কারাগারের সুপারিনটেনডেন্টকে। এই নির্দেশগুলো কীভাবে বাস্তবায়ন করা হয়েছে সে বিষয়ে ১৫ দিনের মধ্যে আদালতে একটি বাস্তবায়ন প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সাবেক ক্রিকেটার থেকে রাজনীতিক হওয়া ৭৩ বছর বয়সী ইমরান খান ২০২৩ সালের আগস্ট মাস থেকে কারাগারে রয়েছেন। তিনি এবং তার দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ দাবি করে আসছেন যে, তাদের বিরুদ্ধে আনা মামলাগুলো এবং দেওয়া সাজাগুলো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। তার সমর্থক এবং স্বজনরা বারবার অভিযোগ করেছেন যে, কর্তৃপক্ষ তাকে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দেখা করা এবং পর্যাপ্ত চিকিৎসাসেবা পাওয়ার সুযোগ সীমিত করে দিয়েছে।
তবে পাকিস্তান সরকার এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে।
বুশরা বিবিকে প্রথমবার ২০২৪ সালের ৩১ জানুয়ারি দুর্নীতিসংক্রান্ত একটি মামলায় দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পর কারাগারে পাঠানো হয়। প্রায় নয় মাস কারাভোগের পর ওই বছরের ২৪ অক্টোবর তিনি জামিনে মুক্তি পান। তবে এরপর আরেকটি দুর্নীতিসংক্রান্ত মামলায় দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পর ২০২৫ সালের ১৭ জানুয়ারি তাকে পুনরায় গ্রেফতার করা হয়।
এরপর দুর্নীতিসংক্রান্ত আরও কয়েকটি মামলায় তাকে অতিরিক্ত সাজা দেওয়া হয়েছে এবং তিনি বর্তমানে আদিয়ালা কারাগারেই বন্দি রয়েছেন।
ইমরান খানের স্বাস্থ্য নিয়ে বিতর্ক এবং তাকে হাসপাতালে নেওয়ার বিষয়টি নিয়ে সম্প্রতি বিতর্ক তৈরি হয়েছে। গত মাসে পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্ট ইমরান খানকে বেসরকারি শিফা ইন্টারন্যাশনাল হাসপাতালে স্থানান্তরের নির্দেশ দিয়েছিল। তার পরিবার এবং সমর্থকরা তার শারীরিক অবস্থা, বিশেষ করে চলতি বছরের শুরুতে শনাক্ত হওয়া চোখের সমস্যা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন।
তবে ২০ থেকে ২১ আগস্টের মধ্যবর্তী রাতে তাকে শিফা হাসপাতালে না নিয়ে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন পাকিস্তান ইনস্টিটিউট অব মেডিকেল সায়েন্সেস হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে তার কিছু চিকিৎসা-প্রক্রিয়া এবং বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়েছে এবং পরে তাকে আবার আদিয়ালা কারাগারে ফিরিয়ে আনা হয়।
ইমরান খানের পরিবার পুনরায় আদালতের দ্বারস্থ হয়ে যুক্তি দিয়েছে যে, তাকে রাষ্ট্রীয় হাসপাতালে নেওয়ার সিদ্ধান্ত সুপ্রিম কোর্টের আগের নির্দেশের লঙ্ঘন। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে পরবর্তী শুনানি ১৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তাকে ইসলামাবাদের ওই বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি রাখার কথা বলা হয়েছিল। তবে পাকিস্তান সরকার নিরাপত্তাজনিত কারণ দেখিয়ে তাকে রাষ্ট্রীয় হাসপাতালে নেওয়ার সিদ্ধান্তের পক্ষে যুক্তি দিয়েছে।
এই ঘটনায় আদালত অবমাননার একটি আবেদন আগামী ১৬ সেপ্টেম্বর শুনানির জন্য নির্ধারিত হয়েছে। বিচারপতি শহীদ ওয়াহিদ, নাঈম আখতার আফগান এবং ইশতিয়াক ইব্রাহিম সমন্বিত তিন সদস্যের একটি বেঞ্চ এই শুনানি করবেন। এই একই বেঞ্চে ইমরান আন খানের স্বাস্থ্য এবং তার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ সংক্রান্ত বিচারাধীন মামলাগুলোরও শুনানি হবে।
