পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও কিংবদন্তি ক্রিকেটার ইমরান খানের কারাবন্দিত্ব ও তাঁর মুক্তি নিয়ে কমনওয়েলথ সচিবালয়ের নেওয়া পদক্ষেপের বিষয়ে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন ব্রিটিশ হাউস অব লর্ডসের সদস্য জ্যাক গোল্ডস্মিথ। ইমরান খানের মুক্তির বিষয়ে পাকিস্তান সরকারের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে বিষয়টি উত্থাপন করার জন্য জ্যাক গোল্ডস্মিথ কমনওয়েলথ মহাসচিবের কাছে আবেদন জানিয়েছিলেন।
সেই আবেদনের প্রেক্ষিতে কমনওয়েলথ সচিবালয় থেকে পাঠানো চিঠির প্রতিক্রিয়ায় জ্যাক গোল্ডস্মিথ এটিকে লজ্জাজনক বলে অভিহিত করেছেন। তিনি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে মন্তব্য করেন যে, কমনওয়েলথের পক্ষ থেকে পাওয়া জবাবটি মূলত আমরা কিছুই করছি না—এই কথা বলারই একটি সাংকেতিক ভাষা। গত ২২ আগস্ট জ্যাক গোল্ডস্মিথ কমনওয়েলথ মহাসচিব শার্লি বচওয়ের কাছে একটি চিঠি পাঠিয়েছিলেন।
সেই চিঠির উত্তরে শার্লি বচওয়ে জানান, কমনওয়েলথ সচিবালয় সব সদস্যরাষ্ট্রের শাসনব্যবস্থা, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া, মানবাধিকার ও আইনের শাসন নিয়ে পাওয়া প্রতিবেদন ও চিঠিপত্রকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে। লন্ডনের মার্লবোরো হাউস থেকে পাঠানো এবং কমনওয়েলথ মহাসচিবের স্বাক্ষরযুক্ত ওই চিঠিতে বলা হয়, জ্যাক গোল্ডস্মিথ তাঁর চিঠিতে যেসব উদ্বেগ তুলে ধরেছেন, সেগুলো সম্পর্কে সচিবালয় অবগত হয়েছে।
চিঠিতে আরও উল্লেখ করা হয়, কমনওয়েলথ চার্টারে বর্ণিত নীতি ও মূল্যবোধ প্রচার ও সমর্থনের লক্ষ্যে সংগঠনটি সব সদস্যরাষ্ট্রের সঙ্গে কাজ করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এই ধারাবাহিকতায় পাকিস্তানের সঙ্গেও কমনওয়েলথের গঠনমূলক যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে বলে চিঠিতে জানানো হয়। তবে ইমরান খানের বিরুদ্ধে চলমান মামলার বিষয়ে পাকিস্তানের সঙ্গে বর্তমানে ঠিক কী ধরনের যোগাযোগ চলছে বা এ বিষয়ে কমনওয়েলথ ভবিষ্যতে কোনো নির্দিষ্ট পদক্ষেপ নেবে কি না, সে বিষয়ে চিঠিতে বিস্তারিত কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি।
এই অস্পষ্টতার কারণেই জ্যাক গোল্ডস্মিথ ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। ইমরান খান বর্তমানে দুর্নীতির মামলায় কারাবন্দী রয়েছেন। তিনি ২০১৮ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক মামলা দায়ের করা হয় এবং বিভিন্ন মামলায় তিনি সাজাপ্রাপ্ত হয়েছেন। তবে ৭৩ বছর বয়সী ইমরান খান তাঁর বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন এবং মামলাগুলোকে রাজনৈতিকভাবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করে আসছেন।
ইমরান খানের কারাবন্দিত্ব ও তাঁর শারীরিক অবস্থা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ বাড়ছে। গত ২৪ আগস্ট ২১ জন সাবেক আন্তর্জাতিক ক্রিকেট অধিনায়ক পাকিস্তান সরকারের কাছে একটি যৌথ চিঠি পাঠিয়েছেন। সেই চিঠিতে ইমরান খানের চিকিৎসা ও কারাবন্দী অবস্থায় তাঁকে ন্যূনতম সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়েছে। এছাড়া অস্ট্রেলিয়ার টেস্ট অধিনায়ক প্যাট কামিন্সসহ বিশ্বের অনেক বিশিষ্ট ব্যক্তি ইমরান খানের পাশে দাঁড়িয়েছেন।
পাকিস্তানের কিংবদন্তি ক্রিকেটার জাভেদ মিয়াঁদাদও ইমরান খানকে জাতীয় বীর হিসেবে অভিহিত করে তাঁর দ্রুত মুক্তি ও সমস্যার সমাধানের জন্য প্রার্থনা করেছেন। এছাড়া মাইকেল আথারটনসহ অনেক ক্রিকেট ব্যক্তিত্ব ইমরান খানের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। ১৯৯২ সালে ইমরান খানের নেতৃত্বে পাকিস্তান প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ জয় করেছিল।
সেই সাফল্যের পর থেকে তিনি পাকিস্তানের ক্রিকেটে এক অবিসংবাদিত নাম। খেলা ছাড়ার পর রাজনীতিতে যোগ দিয়ে তিনি ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। বর্তমানে তাঁর কারাবন্দিত্বের বিষয়টি পাকিস্তানসহ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। কমনওয়েলথ সচিবালয়ের পক্ষ থেকে পাকিস্তানের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রাখার কথা বলা হলেও, জ্যাক গোল্ডস্মিথের মতো অনেকেই মনে করছেন যে, এই বিষয়ে আরও জোরালো ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন ছিল।
কমনওয়েলথের এই নীরবতা বা অস্পষ্ট অবস্থান নিয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ইমরান খানের সমর্থকরা বিভিন্ন মহলে সমালোচনা করছেন।
