ইন্দোনেশিয়ার প্রধান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আগ্নেয়গিরির অগ্নুৎপাতের কারণে শত শত ফ্লাইট স্থগিত করা হয়েছে, যার ফলে হাজার হাজার যাত্রী আটকা পড়েছেন। রবিবার সকালে জাকার্তার সুকর্ণ-হাট্টা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কাছাকাছি আকাশসীমায় আনাক ক্রাকাতাও আগ্নেয়গিরির ছাই শনাক্ত হওয়ার পর কর্তৃপক্ষ ২০৯টি ফ্লাইট স্থগিত করার ঘোষণা দেয়। শুক্রবার গভীর রাতে আগ্নেয়গিরিটিতে অগ্নুৎপাত শুরু হয় এবং তখন থেকেই সেখানে ক্রমাগত ভূ-কম্পন, লাভা নিঃসরণ এবং বিকট শব্দ শোনা যাচ্ছে।
রবিবার ভোরে আরও দুটি বড় ধরনের অগ্নুৎপাতের ঘটনা ঘটে বলে কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করেছে। এই ফ্লাইট স্থগিতাদেশের ফলে ২২ হাজারেরও বেশি যাত্রী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন এবং বিমান চলাচল বন্ধের সময়সীমা রবিবার দুপুর দেড়টা পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। দেশটির পরিবহন মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এই সিদ্ধান্তের ফলে সিঙ্গাপুর, দোহা, সিডনি এবং কুয়ালালামপুরসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক রুটের ফ্লাইট চলাচল ব্যাহত হয়েছে।
জাভা এবং সুমাত্রা দ্বীপের মধ্যবর্তী সুন্দা প্রণালীতে অবস্থিত এই আগ্নেয়গিরির সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ডের কারণে কোনো সুনামি সতর্কতা জারি করা হয়নি বলে কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করেছে। তবে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় স্থানীয় বাসিন্দাদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী সংশ্লিষ্ট এলাকার বাসিন্দাদের ঘরের ভেতরে থাকার এবং শ্বাসকষ্ট, চোখের সমস্যা ও ত্বকের ক্ষতি এড়াতে মাস্ক ব্যবহারের আহ্বান জানিয়েছেন।
স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে ছাইয়ের কারণে নানা ধরনের শারীরিক অস্বস্তি দেখা দিয়েছে। অনেক শিক্ষার্থী ও বাসিন্দা চোখের জ্বালাপোড়ার অভিযোগ করেছেন, যার ফলে শনিবার বেশ কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কার্যক্রম বন্ধ রাখা হয়। জেলেরা সমুদ্রে মাছ ধরা বন্ধ রেখেছেন কারণ তারাও চোখের সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন। স্থানীয় বাসিন্দা আলদি চান্দ্রা প্রায়োগি জানান, শুক্রবার সন্ধ্যা থেকেই তিনি ছাইয়ের প্রভাব অনুভব করছেন।
তার মতে, এটি চোখের ভেতর বালুর কণা প্রবেশের মতো অনুভূতি তৈরি করছে এবং চোখের জ্বালাপোড়া কমাতে তাকে ড্রপ ব্যবহার করতে হচ্ছে। ছাইয়ের পুরু স্তর এত বেশি যে তাকে প্রতি পাঁচ মিনিট অন্তর বাড়ির সামনের আঙিনা পরিষ্কার করতে হচ্ছে। আনাক ক্রাকাতাও আগ্নেয়গিরিটি বিংশ শতাব্দীর শুরুতে সমুদ্র থেকে জেগে ওঠে।
এটি ১৮৮৩ সালে মাউন্ট ক্রাকাতাওয়ের অগ্নুৎপাতের ফলে সৃষ্ট ক্যালডেরার অংশ। আগ্নেয়গিরিটি ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে আংশিক ধসে পড়েছিল, যা একটি বিশাল সুনামির সৃষ্টি করে। সেই ঘটনায় সুমাত্রা ও জাভার উপকূলীয় অঞ্চলে ৪০০ জনেরও বেশি মানুষ প্রাণ হারান এবং হাজার হাজার মানুষ আহত ও বাস্তুচ্যুত হন। বিজ্ঞানীরা পরবর্তীতে গবেষণায় দেখেছেন যে, ধসে পড়ার সময় আগ্নেয়গিরি থেকে খসে পড়া পাথরের টুকরোগুলো ৭০ থেকে ৯০ মিটার পর্যন্ত উঁচু ছিল।
ইন্দোনেশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরীয় 'রিং অফ ফায়ার'-এর ওপর অবস্থিত। এই অঞ্চলটি অত্যন্ত সক্রিয় এবং এখানে ঘন ঘন ভূমিকম্প ও আগ্নেয়গিরির অগ্নুৎপাত ঘটে থাকে। প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপকূলীয় এলাকা জুড়ে এই আগ্নেয়গিরি ও ভূমিকম্পের বলয় বিস্তৃত। বর্তমান পরিস্থিতিতে বিমান চলাচল স্বাভাবিক করার জন্য কর্তৃপক্ষ পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। তবে আগ্নেয়গিরির ক্রমাগত সক্রিয়তা এবং বাতাসে ছাইয়ের ঘনত্বের কারণে বিমান চলাচল পুনরায় শুরু করার ক্ষেত্রে নিরাপত্তা ঝুঁকি বিবেচনা করা হচ্ছে।
যাত্রীদের ধৈর্য ধরার আহ্বান জানিয়ে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে যে, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার সাথে সাথে ফ্লাইট সূচি পুনরায় নির্ধারণ করা হবে।
