বাজেটে সৌরপণ্যের ওপর করছাড়ের ঘোষণা দেওয়া হলেও খুচরা বাজারে এসব পণ্যের দাম কমেনি, বরং লোডশেডিং বৃদ্ধির কারণে চাহিদা বাড়ায় দাম আরও বেড়ে গেছে। রাজধানীর গুলিস্তান, নবাবপুর এবং কাপ্তান বাজারের মতো প্রধান সোলার মার্কেটগুলোতে ক্রেতা ও ব্যবসায়ীদের সাথে কথা বলে এই চিত্রটি উঠে এসেছে।
পুরান ঢাকার একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী আশিক হাসান জানান, তিনি বাজেটে করছাড়ের কথা শুনে সোলার প্যানেল কিনতে এসেছিলেন, কিন্তু বাজারে এসে পণ্যের দাম শুনে অবাক হয়েছেন। তার মতে, তবে করছাড়ের কোনো প্রভাবই বাজারে পড়েনি।
কাপ্তান বাজারের ব্যবসায়ী কামরুল ইসলাম বলেন, বর্তমানে সোলার পণ্যের চাহিদা বৃদ্ধি পেয়েছে। কয়েক মাস আগে যে ব্যাটারি ১৮ থেকে ১৯ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছিল, এখন তা ২৩ থেকে ২৪ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
রাজধানীর বাজারে ৫৫০ ওয়াটের একটি সোলার প্যানেল ১৩ হাজার ৫০০ থেকে ১৯ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ৫ কিলোওয়াটের ইনভার্টারের দাম ৪৮ হাজার থেকে ১৭ হাজার টাকা এবং ৫ দশমিক ১২ কিলোওয়াট-ঘণ্টার লিথিয়াম ব্যাটারি ৯৮ হাজার থেকে ১ লাখ ৩০ হাজার টাকা। অর্থাৎ, প্যানেল, ইনভার্টারের মতো প্রধান উপকরণগুলো কিনতেই ১ লাখ ৬০ হাজার থেকে ২ লাখ ২৫ হাজার টাকা খরচ হচ্ছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের নতুন অর্থবছরের ব্যবস্থায় লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারির আমদানি শুল্ক ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে শূন্য করা হয়েছে এবং সোলার প্যানেলের শুল্ক ১ শতাংশ থেকে শূন্য করা হয়েছে। সোলার ইনভার্টারও শুল্ক-কর অব্যাহতির আওতায় এসেছে।
তবে খাতসংশ্লিষ্টরা অভিযোগ করছেন যে, এই সুবিধা মূলত নির্দিষ্ট শর্ত পূরণকারী শিল্পপ্রতিষ্ঠান, রেসকো এবং ইপিসি-র মতো অনুমোদিত প্রকল্পের জন্য সীমিত। বাণিজ্যিক আমদানিকারকদের জন্য একই সুবিধা না থাকায় সাধারণ ভোক্তার কাছে এই করছাড়ের সুফল পৌঁছাচ্ছে না।
বাংলাদেশ সাসটেইনেবল অ্যান্ড রিনিউএবল এনার্জি অ্যাসোসিয়েশন (বিএসআরইএ) বিদ্যুৎ বিভাগের সচিবকে দেওয়া এক চিঠিতে জানিয়েছে, বাণিজ্যিক আমদানিকারকদের জন্য লিথিয়াম সেল এবং ব্যাটারির মোট শুল্ক-কর ৫৮ দশমিক ৪ শতাংশ, যেখানে রেসকো ও ইপিসির ক্ষেত্রে তা মাত্র ১৭ শতাংশ। এছাড়া সোলার ইনভার্টারে বাণিজ্যিক আমদানিকারকদের করভার ২৮ শতাংশ এবং ডিসি ক্যাবলে ৬১ দশমিক ৮০ শতাংশ।
বিএসআরইএ-র সভাপতি মোস্তফা আল মাহমুদ বলেন, দেশে সৌরবিদ্যুতের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে, তবে তা কাজে লাগাতে হলে নীতিগত সহায়তা প্রয়োজন। তিনি অন্তত দুই বছরের জন্য কর অবকাশ সুবিধা দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
এনগ্রিন ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জাহিদুল ইসলাম বলেন, সোলার মাউন্টিংয়ে প্রায় ৫৮ শতাংশ এবং ব্যাটারিতে ৬৪ শতাংশ পর্যন্ত কর রয়েছে। তিনি সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় সৌরবিদ্যুৎ নিতে কর অবকাশের পাশাপাশি সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা করার কথা বলেন।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, সরকার দীর্ঘদিন ধরে সৌরপণ্যে নীতি সহায়তা দিয়ে আসছে। তবে সব পণ্যে কর শূন্য করে দিলে নিম্নমানের পণ্যের ঝুঁকি থাকে। ব্যবসায়ীদের সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব এলে তা বিবেচনা করা হবে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে নেট মিটারিংভিত্তিক ৪ হাজার ৫৫১টি রুফটপ সোলার স্থাপনা রয়েছে, যার মোট সক্ষমতা ২১৩ দশমিক ৩ মেগাওয়াট। এর মধ্যে ৬০ দশমিক ৪ শতাংশ স্থাপনা ঢাকা বিভাগে অবস্থিত।
সুনীল জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. ইজাজ হোসেন বলেন, জাতীয় নিরাপত্তার জন্য নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসার এখন গুরুত্বপূর্ণ। পরিবেশ দূষণ কমানোর জন্য এবং নিজস্ব জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে যেতে হবে।
টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, দেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানির মোট স্থাপিত সক্ষমতা ১ হাজার ৮০৬ দশমিক ৮ মেগাওয়াট, যা দেশের মোট উৎপাদন সক্ষমতার মাত্র ৫ দশমিক ৫৭ শতাংশ। সরকারের পরিকল্পনা রয়েছে ২০৩০ সালের মধ্যে আরও ১০ হাজার থেকে ১২ হাজার মেগাওয়াট নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ সক্ষমতা যুক্ত করার।
