বাংলাদেশ রেলওয়ের বিদ্যমান অবকাঠামো ব্যবহার করে নিজস্ব অর্থায়নে যাত্রীবাহী ট্রেন পরিচালনার প্রস্তাব দিয়েছে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ওয়েস্টার্ন ইঞ্জিনিয়ারিং প্রাইভেট লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে ঢাকা-কক্সবাজার-ঢাকা রুটে এই সেবা চালুর আগ্রহ প্রকাশ করা হয়েছে। তবে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ এই প্রস্তাবটি নিয়ে এখনো চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেনি। প্রস্তাবটি বর্তমানে পর্যালোচনা পর্যায়ে রয়েছে এবং এ বিষয়ে গত ২৮ জুলাই রেলওয়ের মহাপরিচালকের কার্যালয়ে একটি বিশেষ সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
সভায় রেলওয়ের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা এই উদ্যোগের বিভিন্ন দিক নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। রেলওয়ের নথিপত্র থেকে জানা যায়, ওয়েস্টার্ন ইঞ্জিনিয়ারিং প্রাইভেট লিমিটেড মূলত সড়ক, সেতু, পানি নিয়ন্ত্রণ অবকাঠামো এবং ড্রেজিংয়ের মতো নির্মাণকাজের সঙ্গে যুক্ত একটি প্রতিষ্ঠান। ১৯৮৪ সালে যাত্রা শুরু করা এই গ্রুপটি দীর্ঘ চার দশকের অভিজ্ঞতা এবং বিপুল সংখ্যক যন্ত্রপাতি ও জনবল থাকার দাবি করে।
তবে যাত্রীবাহী ট্রেন পরিচালনার মতো অত্যন্ত জটিল ও ঝুঁকিপূর্ণ কাজে প্রতিষ্ঠানটির সরাসরি কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা নেই। রেলওয়ের কর্মকর্তারা সভায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন যে, অবকাঠামো নির্মাণে দক্ষ হলেও ট্রেন পরিচালনার কারিগরি জ্ঞান ও সক্ষমতা তাদের আছে কি না, তা যাচাই করা প্রয়োজন। ট্রেন পরিচালনার সঙ্গে ট্রেনের নিরাপত্তা, লোকোমোটিভ ও কোচ রক্ষণাবেক্ষণ, চালক ও গার্ডের ব্যবস্থাপনা, সিগন্যালিং এবং জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার মতো বিষয়গুলো ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
সভায় উপস্থিত রেলওয়ের কর্মকর্তারা টিকিট রিজার্ভেশন ব্যবস্থা, অভিযোগ ব্যবস্থাপনা, দুর্ঘটনা ঘটলে দায়-দায়িত্ব নির্ধারণ, জ্বালানি ব্যয় এবং জনবল নিয়োগের মতো বিষয়গুলো নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। বিশেষ করে, বর্তমানে রেলওয়ের নিজস্ব ওয়ার্কশপগুলোতে সব কোচের রক্ষণাবেক্ষণ শতভাগ সম্পন্ন করা সম্ভব হয় না। এই পরিস্থিতিতে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রস্তাবিত ট্রেনের রেক রক্ষণাবেক্ষণ কীভাবে হবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।
এছাড়া ঢাকা স্টেশন থেকে বর্তমানে যে পরিমাণ ট্রেন চলাচল করে, তাতে নতুন করে আরও ট্রেন পরিচালনার জন্য স্টেশনের অবকাঠামোগত পরিবর্তনের প্রয়োজন হতে পারে। রেলওয়ের মহাপরিচালক সভায় জানিয়েছেন, বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় ট্রেন পরিচালনার বিষয়টি রেলওয়ের জন্য সম্পূর্ণ নতুন একটি ধারণা। তিনি উল্লেখ করেন, শুরুতে ওয়ার্কশপ সুবিধা দেওয়া সম্ভব হলেও পরবর্তী সময়ে প্রতিষ্ঠানটিকে নিজস্ব অর্থায়নে ওয়ার্কশপ তৈরি করতে হবে।
এছাড়া কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা বা অনিয়মের কারণে ক্ষয়ক্ষতি হলে তার দায়ভার ওয়েস্টার্ন গ্রুপকেই বহন করতে হবে। রেলওয়ের পক্ষ থেকে আরও জানানো হয়েছে যে, বর্তমানে ঢাকা-কক্সবাজার রুটে রেলওয়ের নিজস্ব ট্রেন পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে। তাই এই রুট ছাড়া অন্য কোনো রুটে ট্রেন পরিচালনার সুযোগ আছে কি না, তা নিয়েও পরীক্ষা-নিরীক্ষা প্রয়োজন।
ওয়েস্টার্ন ইঞ্জিনিয়ারিং প্রাইভেট লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বশির আহমেদ জানিয়েছেন, তারা নিজস্ব অর্থায়নে কোচ ও ইঞ্জিন কিনে সরকারি রেল লাইন ব্যবহার করে ট্রেন চালাতে আগ্রহী। তিনি দাবি করেন, তাদের গ্রুপের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান রেলওয়ের টিকেটিং সিস্টেম ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত রয়েছে। এছাড়া সুযোগ পেলে তারা রেলওয়ের অবসরপ্রাপ্ত দক্ষ কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের নিয়োগ দিয়ে ট্রেন পরিচালনা করতে সক্ষম।
যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ড. মো. হাদিউজ্জামান এ বিষয়ে মত দিয়েছেন যে, বিশ্বের অনেক দেশে সরকার অবকাঠামো তৈরি করে দেয় এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ট্রেন পরিচালনা করে। তবে বাংলাদেশে এই মডেলের অভিজ্ঞতা খুব একটা সুখকর নয়। তিনি পরামর্শ দিয়েছেন, যদি সরকার এই মডেল চালু করতে চায়, তবে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে ট্রেন পরিচালনায় দক্ষ কোনো বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে কাজ করতে হবে।
রেলওয়ের মহাপরিচালক জানিয়েছেন, এই প্রস্তাবটি নিয়ে আরও বিস্তারিত আলোচনা এবং সরকারি অনুমোদনের প্রয়োজন রয়েছে। বর্তমানে গার্ড ও লোকোমোটিভ মাস্টারের স্বল্পতার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা হচ্ছে। সামগ্রিকভাবে, রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ এই প্রস্তাবের অপারেশনাল সক্ষমতা ও নিরাপত্তার বিষয়গুলোকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। সরকারি রেলপথে বেসরকারি বিনিয়োগের বিষয়টি এখনো প্রাথমিক আলোচনার পর্যায়ে রয়েছে এবং এর বাস্তবায়ন নির্ভর করছে সরকারের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ওপর।
