গত কয়েক দশকে বাংলাদেশ আয়-ভিত্তিক পরম দারিদ্র্য নিরসনে বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। তবে সামষ্টিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও পরিসংখ্যানিক দারিদ্র্য হ্রাসের সূচকের আড়ালে একটি গভীর কাঠামোগত সংকট ঘনীভূত হচ্ছে, যাকে বিশেষজ্ঞরা সুযোগের দারিদ্র্য হিসেবে অভিহিত করছেন। এটি কেবল আয়ের চরম ঘাটতি নয়, বরং এমন এক প্রাতিষ্ঠানিক ও সামাজিক অবস্থা যেখানে সাধারণ নাগরিক মানসম্মত শিক্ষা, সম্মানজনক কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্যসেবা, প্রাতিষ্ঠানিক অর্থায়ন এবং সামাজিক গতিশীলতার মতো জীবন রূপান্তরের মূল চালিকাশক্তিগুলো থেকে বঞ্চিত থাকে।
এই অবস্থায় ব্যক্তির ভবিষ্যৎ তার নিজস্ব মেধা বা শ্রমের চেয়ে তার জন্মস্থান, পারিবারিক শ্রেণিকাঠামো এবং সামাজিক পুঁজির ওপর বেশি নির্ভর করে। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে জাতীয় দারিদ্র্যের হার ২০১০ সালের ৩৭. ১ শতাংশ থেকে কমে ২০২২ সালে ১৮. ৭ শতাংশে নেমে এসেছিল। তবে এই অগ্রগতির ধারা ২০১৬ সালের পর স্থবির হয়ে পড়ে।
বিশ্বব্যাংকের প্রাক্কলন অনুযায়ী, দেশের প্রায় ৬ কোটি ২০ লক্ষ মানুষ যেকোনো আকস্মিক অর্থনৈতিক বা পরিবেশগত ধাক্কায় পুনরায় দারিদ্র্যের অতলে তলিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছেন। ২০২৬ সালের হালনাগাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, জাতীয় দারিদ্র্যের হার ২০২২ সালের ১৮. ৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২৫ সালে আনুমানিক ২১. ৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা সংকুচিত হয়েছে, যা প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ওপর অদৃশ্য পরোক্ষ করের মতো প্রভাব ফেলছে। শিক্ষাব্যবস্থায় এই বৈষম্য সবচেয়ে প্রকট। জাতিসংঘের শিশু তহবিলের ২০২৫ সালের সমীক্ষা অনুযায়ী, ৭ থেকে ১৪ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে মাত্র ৫০. ২ শতাংশের প্রাথমিক পঠন দক্ষতা এবং ৩৯.
২ শতাংশের প্রাথমিক গণনা দক্ষতা রয়েছে। বিশ্বব্যাংকের তথ্যমতে, প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করার পরও ৫১ শতাংশ শিশু একটি সাধারণ বাক্য পড়ে বুঝতে পারে না। এই গুণগত শিক্ষার অভাব শিক্ষার্থীদের শ্রমবাজারে প্রবেশের ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। শ্রমবাজারে উচ্চতর সনদপত্রের অর্থনৈতিক মূল্য হ্রাস পাওয়ায় স্নাতক ডিগ্রিধারীদের বেকারত্বের হার বর্তমানে প্রায় ১৩.
৫ শতাংশ, যা জাতীয় গড়ের প্রায় তিনগুণ। ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী তরুণদের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কোনো শিক্ষা, চাকরি বা প্রশিক্ষণের আওতায় নেই। প্রতি বছর প্রায় ২২ লক্ষ তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করলেও অর্থনীতিতে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে মাত্র ১৪ লক্ষের মতো। ফলে প্রায় ৮ লক্ষ তরুণ প্রতি বছর কর্মসংস্থানের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
যারা কাজ পাচ্ছেন, তাদের প্রায় ৭০ শতাংশই নিম্ন মজুরির অনানুষ্ঠানিক খাতে যুক্ত হতে বাধ্য হচ্ছেন। লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য এই সংকটকে আরও জটিল করে তুলেছে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার তথ্যমতে, তরুণীদের মধ্যে কর্মহীনতার হার ২৭. ১ শতাংশ, যা তরুণদের ১৬. ২ শতাংশের তুলনায় অনেক বেশি। এছাড়া আর্থিক অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রেও নারীরা পিছিয়ে রয়েছেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের উপাত্ত অনুযায়ী, প্রাপ্তবয়স্ক নারীদের মাত্র ৪৩ শতাংশ আনুষ্ঠানিক আর্থিক পরিষেবা ব্যবহার করেন। ভৌগোলিক ও পরিবেশগত বৈষম্যও সুযোগের দারিদ্র্যকে ত্বরান্বিত করছে। রাজধানী ঢাকা ও প্রধান নগরকেন্দ্রগুলোতে সুযোগ-সুবিধা কেন্দ্রীভূত থাকায় প্রান্তিক অঞ্চলের মানুষ বঞ্চিত থাকছেন। ইউনিসেফের হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশের প্রায় ২ কোটি শিশু বন্যা, জলোচ্ছ্বাস ও তীব্র তাপপ্রবাহের মতো জলবায়ু ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
রাষ্ট্রীয় সামাজিক সুরক্ষাবেষ্টনী দারিদ্র্যের অভিঘাত কমাতে পর্যাপ্ত ভূমিকা রাখতে পারছে না। বিশ্বব্যাংকের ২০২৫ সালের ব্যয় বিশ্লেষণ অনুযায়ী, সরকারি পেনশন বাদে সরকার মোট ১৩৯টি সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে জিডিপির মাত্র ১.৮ শতাংশ বরাদ্দ করেছে, যা তরুণ ও বেকার জনগোষ্ঠীর জন্য অপ্রতুল। ডিজিটাল রূপান্তরের যুগে তথ্যের সুযোগ ও দক্ষতার বৈষম্য আরও স্পষ্ট হচ্ছে।
যদিও অনেক পরিবারে ইন্টারনেট সংযোগ রয়েছে, কিন্তু ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সী নারীদের মাত্র ৩৭. ৬ শতাংশের সর্বনিম্ন ডিজিটাল দক্ষতা রয়েছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ধারা বজায় রাখতে এবং এই সংকট মোকাবিলায় নীতিগত সংস্কারের ওপর জোর দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৩.৭ শতাংশ হতে পারে।
প্রবৃদ্ধি অন্তর্ভুক্তিমূলক করার জন্য প্রাথমিক শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করা, কারিগরি শিক্ষার প্রসার এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের আইনি জটিলতা নিরসনের তাগিদ দেওয়া হয়েছে। সুযোগের দারিদ্র্য নিরসন কেবল ত্রাণভিত্তিক কর্মসূচি নয়, বরং এটি একটি টেকসই ও সমতাভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনের মৌলিক প্রশ্ন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
