নোয়াখালীর সুবর্ণচর উপজেলার চরবাটা ইউনিয়নের চর মজিদ গ্রামের বাসিন্দা আবদুল আজিজ মাছের পোনা বিক্রির পেশা থেকে সফল মৎস্য খামারি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। একসময় বাইসাইকেলের পেছনে পাতিল নিয়ে গ্রামে গ্রামে পোনা বিক্রি করা আবদুল আজিজ বর্তমানে ১৫ একর জমির ওপর ১৭টি মাছের হ্যাচারি পরিচালনা করছেন।
তাঁর এই উদ্যোগে স্থানীয় পর্যায়ে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে এবং গ্রামীণ অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়ছে। আবদুল আজিজ ২০১২ সালে মাছ চাষের পেশায় যুক্ত হন। শুরুতে পৈতৃক সূত্রে পাওয়া ২০ শতাংশ জমিতে তিনি চাষাবাদ শুরু করেন। মূলধনের সংকটের কারণে তিনি স্থানীয় বেসরকারি সংস্থা সাগরিকা সমাজ উন্নয়ন সংস্থা থেকে ২০ হাজার টাকা ঋণ গ্রহণ করেন এবং পোনা উৎপাদনের ওপর প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন।
নিষ্ঠা ও কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে তিনি ধীরে ধীরে খামারের পরিধি বাড়াতে থাকেন। নিজের আয়ের অর্থ দিয়ে তিনি দুই একর জমি ক্রয় করেন এবং আরও ১৩ একর জমি লিজ নেন। খামার সম্প্রসারণের জন্য তিনি সাগরিকা সমাজ উন্নয়ন সংস্থা থেকে ছয় লাখ টাকা এবং সোনালী ব্যাংক থেকে চার লাখ টাকার কৃষি ঋণ গ্রহণ করেন।
বর্তমানে ১৫ একর ২০ শতাংশ জমিতে তাঁর ১৭টি হ্যাচারি রয়েছে। এসব হ্যাচারি থেকে বছরে এক থেকে দেড় কোটি মাছের রেণু ও পোনা উৎপাদিত হচ্ছে। আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে আবদুল আজিজ তাঁর খামারে সাফল্য পেয়েছেন। সাগরিকা সমাজ উন্নয়ন সংস্থার মৎস্য কর্মকর্তাদের পরামর্শে তিনি পানিতে অক্সিজেন বাড়ানোর যন্ত্র বা অ্যারোটর মেশিন ব্যবহার শুরু করেন।
এই প্রযুক্তির ফলে পানিতে অক্সিজেনের সঠিক মাত্রা বজায় রাখা সম্ভব হচ্ছে এবং রেণুপোনা বড় করা সহজ হয়েছে। প্রযুক্তির সুফল পাওয়ার পর তিনি নিজে আরও দুই থেকে তিনটি অ্যারোটর মেশিন ক্রয় করেছেন। স্থানীয় মৎস্য কর্মকর্তারা নিয়মিত তাঁর খামার পরিদর্শন করে মাছের রোগবালাই দমন ও সার্বিক সুরক্ষার বিষয়ে পরামর্শ প্রদান করেন।
আবদুল আজিজ জানান, চলতি মৌসুমে তাঁর খামারে প্রায় ২০ থেকে ২২ লাখ টাকা বিনিয়োগ করা হয়েছে। ইতিমধ্যে ২০ থেকে ২৫ লাখ টাকার পোনা বিক্রি হয়েছে এবং মৌসুমে সম্পূর্ণ মাছ বিক্রি শেষে মোট আয় ৩০ থেকে ৩৫ লাখ টাকা ছাড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। জমির ভাড়া ও কর্মচারীদের বেতনসহ সব খরচ বাদ দিয়ে বছরে তাঁর নিট আয় প্রায় ১০ লাখ টাকা।
এই খামারে বর্তমানে ১২ জন স্থায়ী শ্রমিক কাজ করছেন, যাদের মাসিক বেতন ৯ হাজার থেকে ১৮ হাজার টাকা। এছাড়া প্রায় ৬০ জন পোনা বিক্রেতা ও ব্যবসায়ী তাঁর কাছ থেকে পোনা সংগ্রহ করে বিভিন্ন এলাকায় বিক্রি করেন। সব মিলিয়ে প্রায় ৭০ থেকে ৭২টি পরিবার এই খামারের ওপর নির্ভরশীল।
পোনা বিক্রেতা মো. জায়েদ জানান, আগে ময়মনসিংহসহ উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলা থেকে পোনা আনতে হতো, যার ফলে পরিবহনের সময় অনেক পোনা নষ্ট হয়ে যেত। এখন স্থানীয়ভাবে পোনা পাওয়ায় তাদের ঝুঁকি ও ক্ষতি কমেছে এবং আয় বৃদ্ধি পেয়েছে। মৎস্য কর্মকর্তা মো. শহিদুল আলম জানান, ভালো পোনা উৎপাদনের মাধ্যমে মাছ চাষের সামগ্রিক উন্নয়ন সম্ভব হচ্ছে।
প্রান্তিক চাষিদের প্রশিক্ষণ ও কারিগরি সহায়তা প্রদানের মাধ্যমে আধুনিক প্রযুক্তির সাথে তাদের পরিচয় করিয়ে দেওয়া হচ্ছে। আবদুল আজিজ তাঁর সাফল্যের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০২২ সালে উপজেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ মৎস্যচাষি সম্মাননা এবং ২০২৫ সালে জাতীয় মৎস্য পুরস্কার লাভ করেন। এছাড়া পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ) থেকেও তিনি জাতীয় সম্মাননা অর্জন করেছেন।
আবদুল আজিজের সাফল্যে অনুপ্রাণিত হয়ে এলাকার অনেক বেকার যুবক বাণিজ্যিকভাবে মাছ চাষে আগ্রহী হচ্ছেন। তবে খামার সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে শুষ্ক মৌসুমে পানির সংকট একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে। এই সংকট মোকাবিলায় তিনি সরকারি সহায়তার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন।
