ভেনেজুয়েলার বিশাল তেলভাণ্ডারের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্র একটি নতুন চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। গত ২৮ আগস্ট মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই চুক্তিকে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় তেল চুক্তি হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি দাবি করেন, এই চুক্তির ফলে যুক্তরাষ্ট্রের তেলের মজুত দ্বিগুণের বেশি বৃদ্ধি পাবে এবং মার্কিন নাগরিকদের জন্য জ্বালানির দাম উল্লেখযোগ্য হারে কমে আসবে।
তবে জ্বালানি খাতের বিশ্লেষকরা এই দাবির সঙ্গে একমত নন এবং তারা মনে করছেন, স্বল্প মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রে তেলের দাম কমার কোনো সম্ভাবনা নেই। ভেনেজুয়েলায় বিশ্বের সবচেয়ে বেশি প্রমাণিত তেলের মজুত রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে প্রায় ৩০৩ বিলিয়ন ব্যারেল তেল রয়েছে, যা বিশ্বের মোট মজুতের প্রায় ১৭ শতাংশ।
নতুন এই চুক্তির আওতায় যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার ৬৫ বিলিয়ন ব্যারেল তেলের নিয়ন্ত্রণ পাবে, যা দেশটির মোট মজুতের এক-পঞ্চমাংশেরও বেশি। তবে ভেনেজুয়েলার তেল ভারী এবং সালফারসমৃদ্ধ হওয়ায় তা উত্তোলন ও পরিশোধন করা অত্যন্ত ব্যয়বহুল। হোয়াইট হাউজের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র নর্থ আমেরিকান ব্লু এনার্জি পার্টনার্সের সঙ্গে একটি যৌথ উদ্যোগ তৈরি করছে।
এই প্রতিষ্ঠানের মালিক ভেনেজুয়েলার ধনকুবের আলেহান্দ্রো বেতানকুর্ট। চুক্তিতে মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের অফিস অব স্ট্র্যাটেজিক ক্যাপিটালের ৩৫ শতাংশ অংশীদারত্ব থাকবে। এই যৌথ উদ্যোগটি দৈনিক প্রায় দুই লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল উৎপাদনের সক্ষমতা রাখে এবং চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র উৎপাদিত তেলের ২০ শতাংশ উৎপাদন খরচের দামে কেনার অধিকার পাবে।
চুক্তি ঘোষণার পর যুক্তরাষ্ট্রে অপরিশোধিত তেলের দাম বরং বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশ্লেষক জোহানেস রাউবাল জানান, চুক্তির আগে ডব্লিউটিআই অপরিশোধিত তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ৮৩ থেকে ৮৬ ডলারের মধ্যে থাকলেও তা পরবর্তীতে ৯০ ডলার ছাড়িয়ে যায়। ব্রেন্ট ক্রুডের দামও ৯৫ ডলারের উপরে উঠে যায়। এর পেছনে মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং হরমুজ প্রণালিতে সরবরাহ বিঘ্নকে প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
ভেনেজুয়েলার তেল অবকাঠামোর বড় অংশই বর্তমানে জরাজীর্ণ। পাইপলাইন ব্যবস্থার ত্রুটি এবং পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ সরবরাহের অভাব তেল উত্তোলনের পথে বড় বাধা। এছাড়া ভারী তেল প্রক্রিয়াজাতের জন্য বিশেষায়িত অবকাঠামোর ঘাটতি রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াতে কয়েক বছর সময় প্রয়োজন। যুক্তরাষ্ট্রের শোধনাগারগুলোও বর্তমানে পূর্ণ সক্ষমতায় চলছে, তাই ভেনেজুয়েলার তেল এলেও তাৎক্ষণিকভাবে বাজারে বড় কোনো প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা কম।
হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের ২০ শতাংশের বেশি তেল ও গ্যাস পরিবহন করা হয়। সংঘাতের কারণে এই জলপথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিশ্ববাজারে জ্বালানি সংকট তৈরি হয়েছে। মিডল ইস্ট কাউন্সিল অন গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্সের ফ্রেডেরিক স্নাইডার মনে করেন, ভেনেজুয়েলার তেল উপসাগরীয় অঞ্চলের হালকা তেলের বিকল্প হতে পারে না।
এই চুক্তির ফলে সবচেয়ে বেশি লাভবান হচ্ছে মার্কিন তেল কোম্পানিগুলো। চুক্তি ঘোষণার পর শেভরনের শেয়ারের দাম ২ দশমিক ২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস রাইট জানিয়েছেন, শেভরন ছাড়াও এনিই, ওএনজিসি, জিওপার্ক এবং জিই ভারনোভার মতো আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলো ভেনেজুয়েলায় বিনিয়োগ করতে পারে। ১৯৯০-এর দশকে ভেনেজুয়েলা দৈনিক ৩০ লাখ ব্যারেল তেল উৎপাদন করলেও বর্তমানে তা ১১ থেকে ১২ লাখ ব্যারেলে নেমে এসেছে।
রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে দীর্ঘমেয়াদে উৎপাদন কতটা বাড়বে তা নিয়ে সংশয় রয়েই গেছে। ফলে সাধারণ মানুষের জন্য জ্বালানির দাম কমার বিষয়টি এখনো অনিশ্চিত।
