দেশের ব্যাংক খাতের বিদ্যমান অস্থিরতা দূর করতে এবং আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে সরকার চলতি বছরেই বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ও অগ্রাধিকারভিত্তিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানিয়েছেন, ব্যাংক খাতের সার্বিক পরিস্থিতির উন্নতির জন্য সরকার কাঠামোগত সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে।
অর্থমন্ত্রীর ভাষ্যমতে, এই সংস্কার কার্যক্রমের মূল লক্ষ্য হলো ব্যাংকগুলোতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ কমিয়ে আনা, দীর্ঘদিনের অনিষ্পন্ন ঋণ দ্রুত নিষ্পত্তি করা, ব্যাংকগুলোর ব্যালেন্স শিট পরিষ্কার করা এবং ঋণ পুনরুদ্ধার ও সমস্যাগ্রস্ত সম্পদ ব্যবস্থাপনার জন্য একটি কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক ও আইনগত কাঠামো তৈরি করা। রোববার জাতীয় সংসদে এক প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী এসব তথ্য তুলে ধরেন।
অর্থমন্ত্রী জানান, যেসব ব্যাংকে শ্রেণিকৃত ঋণের হার ১০ শতাংশের বেশি, সেসব ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সরকার নিয়মিত আলোচনা করছে এবং নিবিড় তদারকির ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। এই আলোচনার মাধ্যমে খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির সুনির্দিষ্ট কারণগুলো চিহ্নিত করা হচ্ছে এবং ঋণ আদায়ে বিদ্যমান প্রতিবন্ধকতাগুলো দূর করার চেষ্টা চলছে।
প্রতিটি ব্যাংকের জন্য আলাদা কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে এবং এই কর্মপরিকল্পনার অগ্রগতি নিয়মিত পর্যালোচনা করা হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন। দীর্ঘ সময় ধরে অনাদায়ী এবং প্রচলিত পদ্ধতিতে আদায়ের সম্ভাবনা কম এমন ঋণগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য সরকার বিশেষ এককালীন এক্সিট সুবিধা প্রবর্তন করেছে।
এই সুবিধার আওতায় নির্দিষ্ট শর্তসাপেক্ষে ঋণগ্রহীতারা আগামী ডিসেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত ঋণ নিষ্পত্তির সুযোগ পাবেন। অর্থমন্ত্রীর মতে, এই উদ্যোগের ফলে দীর্ঘদিনের অনিষ্পন্ন ও খেলাপি ঋণের কার্যকর সমাধান সম্ভব হবে এবং ব্যাংকগুলোর ব্যালেন্স শিট থেকে সমস্যাগ্রস্ত সম্পদ অপসারণ করা সহজতর হবে। এছাড়া খেলাপি ঋণ ও সমস্যাগ্রস্ত সম্পদের ব্যবস্থাপনা, পুনর্গঠন ও নিষ্পত্তির জন্য একটি কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক ও আইনগত কাঠামো প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে চলতি বছরের মধ্যেই সরকার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।
এই কাঠামোর মাধ্যমে অনাদায়ী সম্পদের কার্যকর ব্যবস্থাপনা ও পুনর্গঠন নিশ্চিত করা হবে। ব্যাংক খাতের এই সংস্কার কার্যক্রমের মাধ্যমে আর্থিক খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার ওপর জোর দিয়েছে সরকার। অর্থমন্ত্রী আরও জানান যে, ব্যাংকগুলোর আর্থিক স্বাস্থ্যের উন্নতির জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মাধ্যমে তদারকি ব্যবস্থা আরও জোরদার করা হয়েছে।
খেলাপি ঋণ কমানোর পাশাপাশি ব্যাংকগুলোর মূলধন ভিত্তি শক্তিশালী করার দিকেও নজর দেওয়া হচ্ছে। দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে ব্যাংক খাতের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় এই খাতকে স্থিতিশীল করার জন্য সরকার দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে। সংসদীয় আলোচনায় অর্থমন্ত্রী স্পষ্ট করেছেন যে, ব্যাংক খাতের অনিয়ম রোধে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না এবং আইনগত কাঠামোর আওতায় সব ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
ব্যাংকগুলোর পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষকে তাদের দায়িত্ব পালনে আরও সচেষ্ট হওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সরকার আশা করছে, গৃহীত এই সংস্কারমূলক পদক্ষেপগুলো বাস্তবায়িত হলে ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা ফিরে আসবে এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা বৃদ্ধি পাবে। ব্যাংকিং খাতের এই পরিবর্তনগুলো পর্যায়ক্রমে কার্যকর করা হবে এবং এর সুফল যাতে সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীরা পান, সেদিকে সরকার সজাগ রয়েছে।
