বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) একটি প্রতিনিধিদল বুধবার বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন। বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খানের নেতৃত্বে এই প্রতিনিধিদলটি দেশের জাতীয় অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি তৈরি পোশাক খাতের বর্তমান সার্বিক পরিস্থিতি, বিভিন্ন উদীয়মান চ্যালেঞ্জ এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান সুদৃঢ় করার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় নীতিগত সহায়তার বিষয়ে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে বিশদ আলোচনা করেন।
বৈঠকে বিজিএমইএর সিনিয়র সহ-সভাপতি ইনামুল হক খান, সহ-সভাপতি মো. রেজোয়ান সেলিম, মিজানুর রহমান, ভিদিয়া অমৃত খান, মো. শিহাব উদ্দোজা চৌধুরী, মোহাম্মদ রফিক চৌধুরীসহ অন্যান্য পরিচালকরা উপস্থিত ছিলেন। বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান দেশীয় শিল্প ও ব্যবসার প্রসারে বর্তমান সরকারের নেওয়া বিভিন্ন শিল্পবান্ধব পদক্ষেপের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
বিশেষ করে এলডিসি উত্তরণ বিলম্বিতকরণ, বন্ধ কারখানা পুনরায় চালুর জন্য ২০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ অর্থায়ন সুবিধা প্রদান, নন-বন্ড কারখানার জন্য বন্ডেড কাঁচামাল সংগ্রহের সুযোগ এবং কাস্টমস প্রক্রিয়া সহজীকরণের মতো সিদ্ধান্তগুলোকে তিনি সরকারের দূরদর্শিতার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে উল্লেখ করেন। তবে আলোচনার মূল অংশে বিজিএমইএ সভাপতি তৈরি পোশাক খাতের বর্তমান কঠিন বাস্তবতা ও চ্যালেঞ্জগুলো রাষ্ট্রপতির সামনে তুলে ধরেন।
তিনি জানান, তীব্র জ্বালানি সংকটের কারণে পর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহ না পাওয়ায় বেশিরভাগ কারখানা তাদের সক্ষমতার অর্ধেকেরও কম উৎপাদনে বাধ্য হচ্ছে, যা রপ্তানি অর্ডার হারানোর ঝুঁকি তৈরি করছে। এছাড়া জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদহার এবং মজুরি সমন্বয়ের কারণে গত তিন বছরে উৎপাদন খরচ প্রায় ৪০ শতাংশ বেড়েছে।
রপ্তানি ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও মন্দা দেখা দিয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে পোশাক রপ্তানি ১.৬৪ শতাংশ এবং ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জুলাই মাসে ১.৯২ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি কমে যাওয়ায় নতুন বিনিয়োগ স্থবির হয়ে পড়েছে। উচ্চ উৎপাদন ব্যয় ও অর্ডার সংকটের কারণে গত তিন বছরে প্রায় ৪০০টি পোশাক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে, যা কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে বড় ধরনের উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই সংকট উত্তরণে বিজিএমইএ রাষ্ট্রপতির কাছে বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট নীতিগত সুপারিশ পেশ করে। জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য দ্রুততম সময়ে অতিরিক্ত দুটি এফএসআরইউ স্থাপন, দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি মূল্য স্থিতিশীল রাখা এবং আমদানি পর্যায়ে সকল শুল্ক-কর প্রত্যাহারের দাবি জানানো হয়। এছাড়া ক্ষুদ্র ও মাঝারি কারখানায় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গ্যাস সংযোগ প্রদান এবং পরিবেশবান্ধব সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারে স্বল্প সুদে ঋণ সুবিধার প্রস্তাব দেওয়া হয়।
অবকাঠামোগত উন্নয়নের ক্ষেত্রে ঢাকা-চট্টগ্রাম এক্সপ্রেসওয়ে দ্রুত বাস্তবায়ন, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে কার্গো শেড নির্মাণ এবং বে-টার্মিনাল ও মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্রবন্দরের কাজ দ্রুত সম্পন্ন করার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়। ব্যাংকিং খাতের সহায়তার জন্য চলতি মূলধন ও বাণিজ্য ঋণের সুদের হার কমানো এবং পোশাক খাতের জন্য বিশেষায়িত পোস্ট-শিপমেন্ট ফাইন্যান্সিং স্কিম প্রণয়নের সুপারিশ করা হয়।
ইজ অব ডুয়িং বিজনেস নিশ্চিত করতে কাস্টমস বন্ড অডিট প্রক্রিয়া জটিলতামুক্ত করা এবং বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে সুতা আমদানি প্রক্রিয়া পুনরায় চালু করার দাবি জানানো হয়। এলডিসি উত্তরণ-পরবর্তী বাণিজ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি সম্পাদনের কূটনৈতিক উদ্যোগ এবং অন্যান্য দেশের সঙ্গে এফটিএ, পিটিএ ও ইপিএ সম্পাদনের কৌশলগত পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানানো হয়।
শ্রমিক কল্যাণের জন্য গাজীপুরে আধুনিক হাসপাতাল নির্মাণে জমি বরাদ্দ এবং ঝুট ব্যবসাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার নীতিমালা প্রণয়নের প্রস্তাবও দেওয়া হয়। রাষ্ট্রপতি বিজিএমইএ নেতৃবৃন্দের বক্তব্য মনোযোগ দিয়ে শোনেন এবং তৈরি পোশাক শিল্পকে জাতীয় অর্থনীতির অন্যতম প্রধান মেরুদণ্ড হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, সাময়িক প্রতিকূলতা কাটিয়ে বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের শীর্ষ অবস্থান বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি।
শিল্পের টেকসই বিকাশ ও সুরক্ষায় সংশ্লিষ্ট সরকারি মন্ত্রণালয় ও কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় নীতিগত সহযোগিতা প্রদানের বিষয়ে তিনি প্রতিনিধিদলকে আশ্বস্ত করেন।
