বাংলাদেশে গত তিন বছরে ৪০৫টি পোশাক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। ২০২৩ সালের জুলাই মাস থেকে ২০২৬ সালের জুন মাস পর্যন্ত এই কারখানাগুলো বন্ধ হয়। জাতীয় সংসদ অধিবেশনে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির এই তথ্য জানিয়েছেন। সংসদ সদস্য মো. রুহুল আমিনের এক প্রশ্নের লিখিত উত্তরে মন্ত্রী এই পরিসংখ্যান তুলে ধরেন।
বন্ধ হওয়া কারখানাগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সদস্যভুক্ত ২৮২টি এবং বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সদস্যভুক্ত ১২৩টি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। বর্তমানে বন্ধ হওয়া কারখানাগুলোর পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরির কাজ চলমান রয়েছে। পোশাক শিল্প বাংলাদেশের অর্থনীতির একটি প্রধান চালিকাশক্তি। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮১ শতাংশ এসেছে এই খাত থেকে।
ওই অর্থবছরে মোট রপ্তানি আয় ছিল প্রায় ৪৮ বিলিয়ন ডলার, যার মধ্যে তৈরি পোশাক খাতের অবদান ছিল প্রায় ৩৮ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার। কারখানা বন্ধ হওয়ার ফলে বিপুল সংখ্যক শ্রমিক কর্মসংস্থান হারিয়েছেন। এর ফলে শ্রমিকদের আয় বন্ধ হওয়ার পাশাপাশি তাদের পরিবারের জীবনযাত্রায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
পোশাক কারখানা বন্ধ হওয়ার পেছনে বেশ কিছু কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বৈশ্বিক করোনা পরিস্থিতি, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এবং আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক মন্দা। এছাড়া দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং ব্যাংকিং খাতে তারল্য সংকটও কারখানাগুলোর ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রেও চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে।
ইউরোপের দেশগুলোর সঙ্গে ভারত ও ভিয়েতনামের মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি হওয়ার ফলে বাংলাদেশ কিছুটা পিছিয়ে পড়ছে। এছাড়া বিদেশি ক্রেতারা ছোট ও মাঝারি কারখানার প্রতি আগ্রহ কমিয়ে দিচ্ছেন। দেশের অভ্যন্তরে গ্যাস ও বিদ্যুতের অনিশ্চয়তা, ঋণের উচ্চ ব্যয়, বন্দরের সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা, কাঁচামাল আমদানির জটিলতা এবং কর ও শুল্কব্যবস্থার অসঙ্গতি উদ্যোক্তাদের জন্য ব্যবসা পরিচালনা কঠিন করে তুলেছে।
উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি এবং শ্রমিক-মালিক সম্পর্কের টানাপোড়েনও এই খাতের ওপর প্রভাব ফেলেছে। জ্বালানি সংকটের কারণে অনেক কারখানার উৎপাদন সক্ষমতা ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পেয়েছে। এর ফলে গত দুই বছরে শতাধিক কারখানা বন্ধ হয়ে প্রায় ৪০ হাজার কর্মসংস্থান কমেছে বলে তথ্য পাওয়া গেছে। পোশাক শিল্পে কর্মসংস্থান হারানো শ্রমিকদের একটি বড় অংশ গ্রামীণ ও নিম্নআয়ের পরিবারের নারী।
এই শিল্পে কাজ করার মাধ্যমে তারা অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন। চাকরি হারানোর পর এই শ্রমিকদের অনেকেই রিকশা চালানো, গৃহকর্ম কিংবা অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন, যা তাদের দক্ষতার অবমূল্যায়ন ঘটাচ্ছে। বিশ্ববাজারে এখন ক্রেতারা পণ্যের দামের পাশাপাশি পরিবেশ রক্ষা, শ্রমিকের অধিকার, জ্বালানি দক্ষতা, কার্বন নিঃসরণ এবং উৎপাদন ব্যবস্থার স্বচ্ছতাকে গুরুত্ব দিচ্ছেন।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও অটোমেশনের ফলে পোশাক উৎপাদনের ধরনেও পরিবর্তন আসছে। তাই শুধু সস্তা শ্রমের ওপর নির্ভর করে বিশ্ববাজারে টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়ছে। এই সংকট মোকাবিলায় শিল্পনীতিতে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োজন। যেসব কারখানা সাময়িক সংকটে রয়েছে, তাদের জন্য সহজ শর্তে পুনঃঅর্থায়ন ও ঋণ পুনর্গঠনের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
তবে এই সহায়তার ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। অদক্ষ ও অনুৎপাদনশীল কারখানাগুলোর জন্য পুনর্গঠন বা একীভূতকরণের পথ খোঁজা প্রয়োজন। এছাড়া ছোট ও মাঝারি কারখানাগুলোর জন্য প্রযুক্তি ও কমপ্লায়েন্স সুবিধা ভাগাভাগির ব্যবস্থা করা যেতে পারে। চাকরি হারানো শ্রমিকদের জন্য জাতীয় পর্যায়ে কার্যকর পুনর্বাসন ও পুনঃদক্ষতা কর্মসূচি গ্রহণ করা প্রয়োজন।
তাদের নতুন প্রযুক্তির মেশিন চালানো, মান নিয়ন্ত্রণ এবং ডিজিটাল উৎপাদন ব্যবস্থার মতো কাজে দক্ষ করে তোলা সম্ভব। একই সঙ্গে চামড়া, জুতা, কৃষিপ্রক্রিয়াজাত শিল্প, ওষুধ এবং তথ্যপ্রযুক্তির মতো অন্যান্য শ্রমঘন শিল্পে বিনিয়োগ বাড়িয়ে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে হবে। পোশাক শিল্পকে আরও শক্তিশালী ও বহুমুখী করার লক্ষ্যে উচ্চমূল্যের পোশাক ও বিশেষায়িত টেক্সটাইল পণ্যের বাজারে প্রবেশ করতে হবে।
কর্মসংস্থানকে অর্থনৈতিক নীতির কেন্দ্রবিন্দুতে ফিরিয়ে আনা এখন সময়ের দাবি। বিনিয়োগের হিসাব করার সময় কতটি টেকসই কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে, তা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। একটি কারখানার বন্ধ হওয়া মানে শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন বন্ধ হওয়া নয়, বরং এর সঙ্গে জড়িত অসংখ্য পরিবারের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়া।
তাই রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো শিল্প খাতের এই সংকট নিরসনে কার্যকর ও বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ গ্রহণ করা।
