২০২৩ সালের জুলাই মাস থেকে ২০২৬ সালের জুন মাস পর্যন্ত তিন বছরের ব্যবধানে বাংলাদেশে চার শতাধিক পোশাক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। জাতীয় সংসদ অধিবেশনে সংসদ সদস্য মো. রুহুল আমিনের এক প্রশ্নের লিখিত জবাবে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির এই তথ্য জানিয়েছেন। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রমের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই অধিবেশনে মন্ত্রী জানান, বন্ধ হওয়া এসব কারখানার মধ্যে বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সদস্যভুক্ত কারখানার সংখ্যা ২৮২টি।
এছাড়া বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সদস্যভুক্ত ১২৩টি কারখানা এই সময়ের মধ্যে তাদের কার্যক্রম বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছে। বাণিজ্যমন্ত্রী জানান, বন্ধ হয়ে যাওয়া এসব কারখানার পূর্ণাঙ্গ নামের তালিকা সংগ্রহের প্রক্রিয়া বর্তমানে চলমান রয়েছে। সংসদ সদস্য মো. রুহুল আমিন তার প্রশ্নে পোশাক কারখানা বন্ধের সুনির্দিষ্ট কারণ এবং এই খাতের উন্নয়নে সরকারের নেওয়া পদক্ষেপ সম্পর্কে জানতে চেয়েছিলেন।
প্রশ্নের জবাবে বাণিজ্যমন্ত্রী কারখানাগুলো বন্ধ হওয়ার পেছনে বেশ কিছু অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক কারণ চিহ্নিত করেছেন। মন্ত্রী জানান, বিশ্বব্যাপী করোনা মহামারির পরবর্তী প্রভাব, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাত এবং আমেরিকা-ইরান উত্তেজনার ফলে বিশ্ব অর্থনীতিতে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। এই বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে মন্দা দেখা দিয়েছে, যা বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
এছাড়া দেশের অভ্যন্তরে রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং অর্থ পাচারের কারণে ব্যাংকিং খাতে যে তারল্য সংকট তৈরি হয়েছে, তা কারখানাগুলোর স্বাভাবিক কার্যক্রম পরিচালনায় বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে ভারত ও ভিয়েতনামের সঙ্গে ইউরোপীয় দেশগুলোর মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) স্বাক্ষরিত হওয়ায় বাংলাদেশ প্রতিযোগিতামূলক বাজারে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।
পাশাপাশি বিদেশি ক্রেতারা তাদের নিজস্ব মনিটরিং বা তদারকির সুবিধার্থে ছোট ও মাঝারি আকারের কারখানাগুলোতে রপ্তানি আদেশ প্রদানে অনাগ্রহ প্রকাশ করছেন, যা কারখানা বন্ধের অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। পোশাক খাতের এই সংকট মোকাবিলায় এবং শিল্পের উন্নয়নে সরকার বিভিন্ন ধরনের প্রণোদনা ও সহায়তা প্রদান করছে বলে মন্ত্রী উল্লেখ করেন।
সরকারের গৃহীত পদক্ষেপগুলোর মধ্যে রয়েছে রপ্তানিমুখী দেশীয় বন্ড খাতে শুদ্ধ বন্ড ও ডিউটি ড্র-ব্যাকের পরিবর্তে ১.৫০ শতাংশ হারে বিকল্প নগদ সহায়তা প্রদান। এছাড়া ইউরো অঞ্চলে বস্ত্র খাতের রপ্তানিকারকদের জন্য বিদ্যমান সহায়তার অতিরিক্ত আরও ০.৫০ শতাংশ বিশেষ সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের বিকাশে তৈরি পোশাক খাতের নিট, ওভেন ও সোয়েটার শিল্পের জন্য ৩ শতাংশ অতিরিক্ত সুবিধা এবং সামগ্রিকভাবে তৈরি পোশাক খাতে ০.৩০ শতাংশ বিশেষ নগদ সহায়তা প্রদানের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
সরকার এই খাতের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং রপ্তানি বাজার ধরে রাখার জন্য বিভিন্ন নীতিগত সহায়তা অব্যাহত রেখেছে বলে বাণিজ্যমন্ত্রী সংসদে জানিয়েছেন। কারখানা বন্ধের এই প্রবণতা পোশাক শিল্পের সামগ্রিক পরিস্থিতির ওপর প্রভাব ফেলছে এবং সরকার এই পরিস্থিতি পর্যালোচনার মাধ্যমে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।
