আন্তর্জাতিক বাজারে তেল, গ্যাস ও কয়লার বর্তমান দাম বজায় থাকলে ২০২৬ সালে বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে আমদানি ব্যয় গত বছরের তুলনায় ২৮০ কোটি মার্কিন ডলার বা প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা বৃদ্ধি পেতে পারে। আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা জিরো কার্বন অ্যানালিটিকস-এর এক বিশ্লেষণে এই তথ্য উঠে এসেছে।
সংস্থাটির হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছর জীবাশ্ম জ্বালানি আমদানি ব্যয় গত বছরের তুলনায় প্রায় ৩০ শতাংশ বাড়তে পারে, যা দেশের মোট বাণিজ্য ঘাটতির প্রায় ১০ শতাংশের সমান। এই বাড়তি ব্যয় দেশের অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতি ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে। গবেষণায় বলা হয়েছে, জ্বালানির বর্তমান দাম অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশের আমদানি সক্ষমতা বা আমদানি কভার ৫ দশমিক ৭ মাস থেকে কমে ৫ দশমিক ২ মাসে নেমে আসতে পারে।
মূলত এলএনজি আমদানির ওপর অত্যধিক নির্ভরতার কারণেই এই সংকট ঘনীভূত হচ্ছে। চলতি বছরের জুলাই ও আগস্ট মাসে হরমুজ প্রণালিতে সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ায় এলএনজি আমদানি প্রায় ৮৩ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। জুলাই মাসে বাংলাদেশ প্রায় ৬ লাখ ৩০ হাজার টন এলএনজি আমদানি করলেও আগস্ট মাসে তা কমে ১ লাখ ১০ হাজার টনে নেমে আসে।
যদিও এলএনজি আমদানি কমেছে, কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বেশি থাকায় সামগ্রিক ব্যয় কমছে না। বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রায় ৬৪ শতাংশ গ্যাসনির্ভর হওয়ায় এলএনজি সরবরাহের এই ঘাটতি বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থায় বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছে। গত ১১ আগস্ট দেশে বিদ্যুৎ সরবরাহের ঘাটতি ৩ হাজার ৫৯২ মেগাওয়াটে পৌঁছায়, যা ওই সময়ের মোট চাহিদার প্রায় ২০ শতাংশ।
গ্যাস সংকটের প্রভাব শিল্প ও কৃষি খাতেও পড়েছে। দেশের সাতটি বড় সার কারখানার মধ্যে ছয়টি গ্যাসের অপর্যাপ্ত সরবরাহের কারণে হয় বন্ধ রয়েছে, নয়তো সীমিত সক্ষমতায় উৎপাদন চালাচ্ছে। এছাড়া সাভার, আশুলিয়া ও ধামরাইয়ের তৈরি পোশাক কারখানাগুলোতে উৎপাদন ১৫ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পেয়েছে। অনেক গ্রামীণ এলাকায় প্রতিদিন আট থেকে ১০ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ বিভ্রাটের খবর পাওয়া গেছে।
দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বাংলাদেশ ২০২৬ থেকে ২০৩৮ সাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র থেকে ১১৭টি এলএনজি কার্গো কেনার চুক্তি করেছে। তবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এলএনজি আমদানির ওপর এই নির্ভরতা জ্বালানি খাতের টেকসই সমাধান নয়। চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জাকির হোসেন খান বলেন, বৈশ্বিক সংকটের সময় সরবরাহ চুক্তি থাকলেও গ্যাস পাওয়ার নিশ্চয়তা থাকে না, অথচ ব্যয় বাড়তেই থাকে।
ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিসের জ্বালানি বিশ্লেষক শফিকুল আলম জানান, ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের এলএনজি আমদানি ৭০০ বিলিয়ন ঘনফুট ছাড়িয়ে যেতে পারে, যার জন্য বছরে ৮৫০ কোটি থেকে ১ হাজার ৪০০ কোটি ডলার পর্যন্ত ব্যয় হতে পারে। এই পরিস্থিতি বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম বাড়িয়ে শিল্পের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা কমিয়ে দিতে পারে।
জিরো কার্বন অ্যানালিটিকস বলছে, জীবাশ্ম জ্বালানিতে যে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় হতে পারে, তা দিয়ে প্রায় ৮ গিগাওয়াট ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন করা সম্ভব। এটি দেশের বর্তমান বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার সঙ্গে আরও ২৫ শতাংশ সক্ষমতা যোগ করতে পারে। বর্তমানে বাংলাদেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের মাত্র ৫ শতাংশের কিছু বেশি নবায়নযোগ্য উৎস থেকে আসে।
জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং আমদানিনির্ভরতা কমাতে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি সৌরবিদ্যুৎ, ব্যাটারি সংরক্ষণব্যবস্থা এবং আন্তঃসীমান্ত জলবিদ্যুতে বিনিয়োগ বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। ২০৩০ সাল নাগাদ ২০ শতাংশ নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা পূরণে প্রতিবছর প্রায় ৭৬০ মেগাওয়াট নতুন সক্ষমতা যুক্ত করা প্রয়োজন, যেখানে বর্তমানে নির্মাণাধীন প্রকল্পের সক্ষমতা মাত্র ৩৫৮ মেগাওয়াট।
