খাবার গ্রহণের সময় নির্দিষ্ট নিয়ম বা ক্রম মেনে চললে রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব বলে জানিয়েছেন চিকিৎসক ও পুষ্টিবিদরা। এই পদ্ধতিকে বলা হয় ফুড সিকোয়েন্সিং। একই প্লেটে থাকা খাবার কোনটির পর কোনটি খাওয়া হচ্ছে, সেই ক্রম ঠিক করাই এই পদ্ধতির মূল ভিত্তি। সাধারণত রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণের কথা বললেই অনেকে ভাত, রুটি বা মিষ্টি জাতীয় খাবার পুরোপুরি বাদ দেওয়ার কথা ভাবেন।
তবে প্রতিদিনের খাবার থেকে এসব পুরোপুরি বাদ না দিয়ে খাওয়ার পদ্ধতিতে সামান্য পরিবর্তন এনেও রক্তে শর্করার ওঠানামা নিয়ন্ত্রণে রাখা যেতে পারে। চিকিৎসক ও পুষ্টিবিদদের মতে, খাবারের শুরুতে সবজি বা সালাদ গ্রহণ করা উচিত। এরপর প্রোটিন ও স্বাস্থ্যকর ফ্যাট গ্রহণ করতে হবে এবং সবশেষে ভাত, রুটি বা অন্যান্য কার্বোহাইড্রেট জাতীয় খাবার গ্রহণ করা প্রয়োজন।
কার্বোহাইড্রেট জাতীয় খাবার তুলনামূলক দ্রুত ভেঙে গ্লুকোজে পরিণত হয়, যার ফলে খাওয়ার পর রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা দ্রুত বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। কিন্তু খাবারের শুরুতেই যদি ফাইবারযুক্ত সবজি বা সালাদ খাওয়া হয়, তবে তা হজম প্রক্রিয়ায় প্রভাব ফেলে। এরপর প্রোটিন ও স্বাস্থ্যকর ফ্যাট গ্রহণ করলে কার্বোহাইড্রেট গ্রহণের আগে পেটে ফাইবার ও প্রোটিন পৌঁছে যায়।
এতে খাবার পাকস্থলী থেকে অন্ত্রে যাওয়ার গতি ধীর হয়ে যায়। ফলে খাবার থেকে তৈরি গ্লুকোজ একসঙ্গে দ্রুত রক্তে প্রবেশ করার বদলে ধীরে ধীরে শোষিত হওয়ার সুযোগ পায়। মাছ, মাংস, ডিম, ডাল কিংবা অন্যান্য প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার এই প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সবজির পর প্রোটিন গ্রহণ করলে কার্বোহাইড্রেট থেকে গ্লুকোজ তৈরির প্রক্রিয়াটি ধীর হয়ে যায়, যা খাবারের পর হঠাৎ করে রক্তে শর্করা বেড়ে যাওয়ার প্রবণতা কমিয়ে দেয়।
ফুড সিকোয়েন্সিংয়ের মূল উদ্দেশ্য ভাত বা রুটি বাদ দেওয়া নয়, বরং এগুলো খাওয়ার সময় বা ক্রম পরিবর্তন করা। উদাহরণস্বরূপ, দুপুরের খাবারে প্রথমে সবজি বা সালাদ, এরপর মাছ বা ডাল এবং সবশেষে ভাত খাওয়া যেতে পারে। একইভাবে রুটির সঙ্গে সবজি ও ডিম থাকলে আগে সবজি, পরে ডিম এবং শেষে রুটি খাওয়ার অভ্যাস করা যেতে পারে।
তবে খাবারের মোট পরিমাণ ও কার্বোহাইড্রেট গ্রহণের মাত্রাও এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। শরীর খাবার থেকে প্রাপ্ত গ্লুকোজ নিয়ন্ত্রণে রাখতে ইনসুলিন তৈরি করে। রক্তে গ্লুকোজ দ্রুত বেড়ে গেলে শরীরকে সেই বৃদ্ধির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দ্রুত প্রতিক্রিয়া দেখাতে হয়। খাবারের ক্রম এমনভাবে সাজালে গ্লুকোজ তুলনামূলক ধীরে রক্তে পৌঁছায়, ফলে রক্তে শর্করার ওঠানামাও কিছুটা কম হয়।
অর্থাৎ, শুধু কতটা কার্বোহাইড্রেট খাচ্ছেন সেটিই নয়, কীভাবে এবং কোন ক্রমে খাচ্ছেন, সেটিও স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলে। তবে এটি মনে রাখা জরুরি যে, ফুড সিকোয়েন্সিং কোনো চিকিৎসা বা ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের একমাত্র পদ্ধতি নয়। ডায়াবেটিস থাকলে ওষুধ, ব্যায়াম, খাবারের পরিমাণ এবং ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য পরিস্থিতি অনুযায়ী খাদ্যাভ্যাস নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
দীর্ঘদিন রক্তে শর্করা ওঠানামা করলে অবশ্যই চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। পরিচিত খাবার বাদ না দিয়েও খাওয়ার ধরনে ছোট পরিবর্তন এনে রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখার এই সহজ কৌশলটি অনুসরণ করা যেতে পারে।
