আয়ারল্যান্ডে কর্মরত বাংলাদেশি শেফ জাহেদ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী খাবারের পরিচিতি তুলে ধরার লক্ষ্যে কাজ করছেন। দীর্ঘ সময় ধরে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রান্নাঘরে পেশাদার শেফ হিসেবে কাজ করার অভিজ্ঞতা থেকে তিনি এই উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। ২০১৬ সালে আন্তর্জাতিক কিচেনে নিজের কর্মজীবন শুরু করা জাহেদ বর্তমানে আয়ারল্যান্ডে ইউরোপীয় ও ব্রিটিশ কুইজিন নিয়ে কাজ করছেন।
এর আগে তিনি মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন পাঁচ তারকা হোটেল এবং আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের প্রি-ওপেনিং টিমের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। দীর্ঘ এই পথচলায় তিনি বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞ শেফদের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ পেয়েছেন। শেফ জাহেদ জানান, বিদেশে কাজ করতে গিয়ে তিনি উপলব্ধি করেছেন যে, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের খাবারের পরিচিতি এখনো আশানুরূপ নয়।
তিনি বলেন, কিচেনে সহকর্মীদের সঙ্গে পরিচয়ের সময় যখন তিনি নিজের দেশের কথা বলেন, তখন অনেকেই বাংলাদেশের খাবারের নাম জানেন না। অথচ ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, থাইল্যান্ড বা চীনের খাবারের পরিচিতি বিশ্বজুড়ে অনেক বেশি। এই বিষয়টি তাকে গভীরভাবে ভাবিয়ে তুলেছে। তিনি মনে করেন, ইলিশ, কাচ্চি বিরিয়ানি, ভুনা খিচুড়ি, মেজবানি মাংস, সাতকড়া দিয়ে রান্না, শুঁটকি, বিভিন্ন ধরনের ভর্তা এবং পিঠার মতো সমৃদ্ধ খাবার থাকা সত্ত্বেও সঠিক প্রচারের অভাবে এগুলো বিশ্বমঞ্চে সেভাবে জায়গা করে নিতে পারেনি।
শেফ জাহেদের মতে, একটি দেশের খাবারকে আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত করার পেছনে শুধু স্বাদই যথেষ্ট নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে ওই দেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য এবং জীবনযাপন। আইরিশদের স্টু, ব্রিটিশদের ফিশ অ্যান্ড চিপস, ফরাসিদের সস বা ইতালিয়ানদের পাস্তা যেভাবে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে গবেষণা ও প্রচারের মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে পরিচিতি পেয়েছে, বাংলাদেশের খাবারের ক্ষেত্রেও সেই পরিকল্পিত উদ্যোগের প্রয়োজন রয়েছে।
তিনি উল্লেখ করেন, বাংলাদেশের অনেক আঞ্চলিক খাবারের সঠিক ইতিহাস ও রান্নার পদ্ধতি এখনো লিখিতভাবে সংরক্ষিত নেই। অনেক রেসিপি কেবল প্রবীণদের স্মৃতিতে সীমাবদ্ধ, যা সংরক্ষণের অভাবে হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। আন্তর্জাতিক কিচেনে কাজ করার সময় তিনি যখন সহকর্মীদের কাছে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের বিরিয়ানি বা ৬৪ জেলার খাবারের বৈচিত্র্য সম্পর্কে তুলে ধরেন, তখন তারা বেশ আগ্রহ প্রকাশ করেন।
এই আগ্রহ থেকেই তিনি নিশ্চিত হয়েছেন যে, মানুষ বাংলাদেশের খাবার সম্পর্কে জানতে আগ্রহী, কিন্তু তাদের কাছে সেই গল্পটি সঠিকভাবে পৌঁছাতে হবে। শেফ জাহেদ নিজেকে কেবল একজন রাঁধুনি হিসেবে নয়, বরং বাংলাদেশের একজন প্রতিনিধি হিসেবে বিবেচনা করেন। তিনি জানান, আন্তর্জাতিক মানের রান্নাঘরে তার পেশাদারিত্ব ও কাজের মান বাংলাদেশের ভাবমূর্তির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।
তিনি বর্তমানে ইউরোপীয় ও ব্রিটিশ রান্নার পাশাপাশি নিজের দেশের খাবারের ইতিহাস ও রেসিপি নিয়ে গবেষণা করছেন। তার লক্ষ্য হলো, বিশ্বের বড় বড় হোটেল ও রেস্টুরেন্টের মেনুতে বাংলাদেশি খাবারের একটি সম্মানজনক স্থান নিশ্চিত করা। তিনি মনে করেন, বাংলাদেশি খাবারকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিতে হলে দক্ষ শেফ তৈরি, রেসিপি ডকুমেন্টেশন, খাদ্য নিরাপত্তার মান বজায় রাখা এবং আধুনিক উপস্থাপনার ওপর জোর দিতে হবে।
এই লক্ষ্য অর্জনে তিনি বাংলা ভাষায় কুলিনারি শিক্ষা ও জ্ঞানভিত্তিক কনটেন্ট তৈরির কাজ করছেন। তিনি একটি পূর্ণাঙ্গ কুলিনারি বই লেখার কাজও চালিয়ে যাচ্ছেন। শেফ জাহেদ নতুন প্রজন্মের শেফদের কেবল রান্নার কৌশল শেখার পাশাপাশি নিজের দেশের খাবারের ইতিহাস, উপাদানের গুণাগুণ এবং স্বাদের বিজ্ঞান সম্পর্কে জানার পরামর্শ দিয়েছেন।
তিনি বিশ্বাস করেন, একক কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের পক্ষে এই পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়। বরং দক্ষ, শিক্ষিত ও দায়িত্বশীল বাংলাদেশি শেফদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় একদিন বিশ্বের বড় বড় কুলিনারি ইনস্টিটিউটে বাংলাদেশের খাবার সম্মানের সঙ্গে উচ্চারিত হবে। আয়ারল্যান্ডে বসেই তিনি এই পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখছেন এবং সেই লক্ষ্যেই প্রতিনিয়ত নিজের দক্ষতা ও জ্ঞানকে কাজে লাগাচ্ছেন।
তার এই দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার মূল উদ্দেশ্য হলো, বিশ্বের কোনো প্রান্তে একজন বিদেশি শেফ যখন গর্বের সঙ্গে বাংলাদেশি খাবার রান্না করবেন, তখন সেই প্রচেষ্টাকে সার্থক হিসেবে গণ্য করা।
