জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) আয়কর রিটার্নে ঘোষিত আয়ের সঙ্গে ব্যাংক লেনদেন এবং সম্পদের তথ্যের অসামঞ্জস্য শনাক্ত করতে একটি স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা চালু করতে যাচ্ছে। কর ফাঁকি রোধ এবং করজাল সম্প্রসারণের লক্ষ্যে এনবিআরের কর বিভাগ এই উদ্যোগ নিয়েছে। নতুন এই ব্যবস্থায় করদাতার রিটার্নে ঘোষিত আয়ের সঙ্গে ব্যাংক লেনদেন, ক্রেডিট কার্ডের ব্যবহার, বিদেশ ভ্রমণ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বড় ব্যয়, গাড়ি কেনা, শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ এবং স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের তথ্যের স্বয়ংক্রিয়ভাবে মিলিয়ে দেখা হবে।
কোথাও অস্বাভাবিক গরমিল পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট করদাতাকে উচ্চঝুঁকির তালিকায় রেখে পরবর্তী সময়ে ঝুঁকিভিত্তিক নিরীক্ষা ও কর নির্ধারণ করা হবে।
এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, করহার না বাড়িয়ে করভিত্তি সম্প্রসারণ, প্রকৃত আয় ও সম্পদের তথ্য শনাক্তকরণ এবং প্রযুক্তিনির্ভর আয়কর প্রশাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে এই কর্মপরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। শুধু টিআইএন ইস্যুর সংখ্যা বাড়ানোকে করভিত্তি সম্প্রসারণ হিসেবে না দেখে প্রকৃত করদাতাকে শনাক্ত করে সক্রিয় কর পরিপালনের আওতায় আনার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
সম্প্রতি অর্থ মন্ত্রণালয়-সংক্রান্ত সংসদীয় কমিটির বৈঠকে এনবিআরের আয়কর, ভ্যাট ও কাস্টমস বিভাগের কর্মকর্তারা রাজস্ব আদায় বাড়াতে বিভিন্ন পরিকল্পনা তুলে ধরেছেন। বৈঠকের কার্যপত্রে করদাতাদের সমন্বিত প্রোফাইল তৈরি, তৃতীয় পক্ষের তথ্যের সঙ্গে রিটার্নের তথ্য মিলিয়ে দেখা এবং ঝুঁকিভিত্তিক অডিট ব্যবস্থার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
এই পরিকল্পনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো ‘ন্যাশনাল ইনকাম ট্যাক্স ডাটা ম্যাচিং সিস্টেম’। এর মাধ্যমে করদাতার রিটার্নে ঘোষিত আয় ও সম্পদের সঙ্গে বিভিন্ন সরকারি ও তৃতীয় পক্ষের উৎস থেকে পাওয়া তথ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে তুলনা করা হবে।
ব্যাংক হিসাব ও বড় অঙ্কের লেনদেন, জমি, বাড়ি ও ফ্ল্যাটের ক্রয়-বিক্রয়, গাড়ির মালিকানা, ব্যবসায়িক লাইসেন্স, আমদানি-রপ্তানি, ক্রেডিট কার্ড ব্যয়, বিদেশ ভ্রমণ, শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ, সরকারি প্রকিউরমেন্ট, উচ্চমূল্যের ইউটিলিটি সংযোগ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বড় ব্যয়, ডিজিটাল ব্যবসা ও ই-কমার্স, পেশাজীবীদের আয় এবং ভাড়া থেকে আয়সহ বিভিন্ন তথ্য এই ব্যবস্থার আওতায় আনা হবে।
তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে টিআইএন না থাকলেও করযোগ্য অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত ব্যক্তিদের শনাক্ত করা হবে। একইভাবে টিআইএন থাকার পরও যারা রিটার্ন দাখিল করেন না, রিটার্ন দাখিল করলেও করযোগ্য আয় না থাকা ব্যক্তিদের এবং দীর্ঘদিন কোনো কার্যক্রম নেই এমন টিআইএনকে বিভিন্ন শ্রেণিতে ভাগ করা হবে। টিআইএন না থাকলেও করযোগ্য অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড রয়েছে এমন ব্যক্তিদের ‘পটেনশিয়াল ট্যাক্সপেয়ার’ হিসেবে শনাক্ত করা হবে।
প্রতিটি করদাতার জন্য একটি সমন্বিত করদাতা প্রোফাইল তৈরি করার পরিকল্পনাও রয়েছে, যাতে ঘোষিত আয়, পরিশোধ করা কর, ব্যাংক লেনদেন, স্থাবর সম্পত্তি, গাড়ি, কোম্পানিতে মালিকানা, শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ এবং অন্যান্য বড় ব্যয়ের তথ্য একত্রে রাখা হবে।
চলতি অর্থবছরের জন্য রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে, যা আগের অর্থবছরের আদায়ের তুলনায় প্রায় ৪৬ শতাংশ বেশি। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রাজস্ব আদায় হয়েছিল ৪ লাখ ১৫ হাজার কোটি টাকা। আয়কর বিভাগকে ২ লাখ ২৩ হাজার ৪৮০ কোটি, মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাট বিভাগকে ২ লাখ ২৩ হাজার ৪৮০ কোটি এবং শুল্ক বিভাগকে ১ লাখ ৫৭ হাজার ৪০ কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্য দেওয়া হয়েছে।
এনবিআরের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক থেকে জানিয়েছেন যে, এই প্রবৃদ্ধি অর্জন করা বেশ চ্যালেঞ্জিং হবে এবং কর আদায়ের পুরো প্রক্রিয়া অটোমেশনের আওতায় আনা হচ্ছে।
উচ্চ সম্পদশালী ব্যক্তিদের জন্য পৃথক প্রোফাইল তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যেখানে তাদের সম্পদ বৃদ্ধির হার এবং জীবনযাপনের ব্যয়ের সঙ্গে প্রদত্ত করের সামঞ্জস্য বিশ্লেষণ করা হবে। করপোরেট পর্যায়েও ঝুঁকিভিত্তিক ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে, যেখানে কোম্পানির মোট লেনদেনের বিপরীতে ঘোষিত মুনাফা, মুনাফার হার এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষের সঙ্গে লেনদেনের মতো আর্থিক সূচক বিশ্লেষণ করা হবে।
এছাড়া আমদানিপণ্যের ঘোষিত মূল্য ও স্থানীয় বাজারে বিক্রির তথ্যের সঙ্গে ভ্যাট ও আয়কর রিটার্নে ঘোষিত লেনদেনের অসামঞ্জস্য যাচাই করা হবে।
বাণিজ্যিক জালিয়াতি এবং অর্থপাচার ঠেকাতে বিদেশে বাংলাদেশের মিশনগুলোতে কাস্টমস অ্যাটাশে নিয়োগের প্রস্তাব রয়েছে। জেলা ও বিভাগীয় শহরগুলোতে সম্পত্তিভিত্তিক আয়কর পরিপালন কর্মসূচি চালুর পরিকল্পনাও রয়েছে। করদাতা ও কর কর্মকর্তার অপ্রয়োজনীয় সরাসরি যোগাযোগ কমাতে আয়কর প্রশাসনকে ডিজিটাল, ফেসলেস এবং ডাটা-ড্রিভেন ব্যবস্থায় রূপট্রান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী তিন মাসের মধ্যে টিআইএন ডাটাবেজ পরিশোধন এবং শ্রেণিবিন্যাসের কাজ করা হবে। তিন থেকে ছয় মাসের মধ্যে উচ্চ সম্পদশালী করদাতাদের জন্য পৃথক ইউনিট কার্যকর করা হবে। ছয় থেকে ১২ মাসের মধ্যে করদাতাদের ব্যাংক হিসাব, সম্পত্তি এবং যানবাহন সংক্রান্ত তথ্য কেন্দ্রীয়ভাবে সংযুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
এক থেকে দুই বছরের মধ্যে ঝুঁকিভিত্তিক অডিট এবং অনলাইনভিত্তিক কর নির্ধারণ ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত ৬ দশমিক ৮ শতাংশ, যা মধ্যমেয়াদে ১০ শতাংশ এবং ২০৩৫ সালের মধ্যে ১৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ বলেন, এই প্রস্তাব দীর্ঘদিন ধরেই আলোচিত হলেও এর কার্যকর বাস্তবায়ন দেখা যায়নি। অর্থনীতিবিদ ড. সেলিম রায়হান বলেন, কর-জিডিপি অনুপাত এখনো ৭ শতাংশের নিচে, যা অনেক দেশের তুলনায় অত্যন্ত কম। করভিত্তি সম্প্রসারণ এবং কর প্রশাসনের দক্ষতা বৃদ্ধি করা অপরিহারণীয়।
