আগামী ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত করার লক্ষ্যে সরকার জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে ১০ বছর মেয়াদী একটি মেগা পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। বর্তমানে এই পরিকল্পনাটি পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর্যায়ে রয়েছে এবং চূড়ান্ত হওয়ার পর তা জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করা হবে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
বুধবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনে কুমিল্লা-১০ আসনের সংসদ সদস্য মো. মোবাশ্বের আলম ভূঁইয়ার এক সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী এই তথ্য জানান। অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম। প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে উল্লেখ করেন যে, ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পৌঁছানোর পথে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতের দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
পরিকল্পনাটি যাচাই-বাছাই শেষ হওয়ার পর জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী এটি সংসদে পেশ করবেন। এর আগে সংসদ সদস্য মোবাশ্বের আলম ভূঁইয়া জানতে চেয়েছিলেন, ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে রূপান্তরের জন্য সরকারের কোনো পরিকল্পনা আছে কি না। জবাবে প্রধানমন্ত্রী জানান, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট বক্তৃতায় এই লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
তিনি স্পষ্ট করেন যে, এই লক্ষ্য কেবল জিডিপির আকার বাড়ানোর বিষয় নয়, বরং এটি সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, বিনিয়োগ, উৎপাদন, কর্মসংস্থান, রপ্তানি, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং অঞ্চলভিত্তিক সুষম উন্নয়নের একটি সমন্বিত রূপান্তর। এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য সরকার ‘থ্রি-আর’ বা তিন ধাপের একটি কৌশল গ্রহণ করেছে। প্রথম ধাপ হলো ‘রিকভারি অ্যান্ড স্ট্যাবিলাইজেশন’ বা পুনরুদ্ধার ও স্থিতিশীলতা, যার লক্ষ্য এক বছরের মধ্যে অর্থনীতির অবনতির ধারা রোধ করে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা।
দ্বিতীয় ধাপ ‘রেস্টোরেশন’ বা পুনঃপ্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সরকারের প্রথম তিন বছরে রাজস্ব ব্যবস্থা, বেসরকারি বিনিয়োগ, ব্যাংক ও আর্থিক খাত, রপ্তানি, কর্মসংস্থান, কৃষি এবং অবকাঠামোর সক্ষমতা পুনরুদ্ধার ও সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে। তৃতীয় ধাপ ‘রিকনস্ট্রাকশন ফর অ্যাকসেলারেশন’ বা দ্রুতগতির জন্য পুনর্গঠনের আওতায় আগামী পাঁচ বছরে অর্থনীতির কাঠামোগত রূপান্তর, উদ্ভাবননির্ভর প্রবৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক সংযোগ সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী জানান, ২০৩০-৩১ অর্থবছরের মধ্যে প্রকৃত জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৮ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত করা এবং মূল্যস্ফীতি ৫ শতাংশের ঘরে নামিয়ে আনার কৌশলগত লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সময়ে মোট বিনিয়োগ জিডিপির ৪০ শতাংশ এবং প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) জিডিপির ২ দশমিক ৭ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
বেসরকারি বিনিয়োগকে প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে গড়ে তুলতে ব্যবসা সহজীকরণ প্রক্রিয়া জোরদার করা হচ্ছে। এর অংশ হিসেবে ‘বাংলাবিজ’ নামে একটি সমন্বিত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম চালু করা হয়েছে এবং ১৯টি সম্ভাবনাময় খাতে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে এফডিআই হিট ম্যাপ প্রকাশ করা হয়েছে। এছাড়া পুঁজিবাজার ও করপোরেট বন্ড শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
রাজস্ব আয় বাড়ানোর ক্ষেত্রেও মধ্যমেয়াদী লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার। ২০৩০-৩১ অর্থবছরের মধ্যে রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত ১১ শতাংশ এবং কর-জিডিপি অনুপাত ৯ দশমিক ৬ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। সরকারি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বাজেট ঘাটতি সহনীয় রাখা, ঋণ ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। জ্বালানি নিরাপত্তা, ডিজিটাল অর্থনীতি সম্প্রসারণ, রপ্তানি বহুমুখীকরণ এবং কৃষিভিত্তিক শিল্পায়নকে সরকারের রূপান্তর কৌশলের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী।
বিশেষ করে উত্তরাঞ্চলে কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, কোল্ড-চেইন এবং লজিস্টিকস অবকাঠামো উন্নয়নের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। সরকারের লক্ষ্য হলো সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে এনে বিনিয়োগ ও উৎপাদন বৃদ্ধির মাধ্যমে ২০৩৪ সালের মধ্যে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির মাইলফলক অর্জন করা।
