দেশে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক থাকলে দাম বাড়ার কোনো সুযোগ নেই বলে জানিয়েছেন খুচরা ও পাইকারি ব্যবসায়ী এবং নিত্যপণ্য আমদানিকারক করপোরেট প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা। মঙ্গলবার রাজধানীর মতিঝিলে এফবিসিসিআই কার্যালয়ে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় ব্যবসায়ীরা এই অভিমত ব্যক্ত করেন। শীর্ষ বাণিজ্য সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক মো. ফজলুল হকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সভায় নিত্যপণ্যের বাজার পরিস্থিতি, সরবরাহ চেইন এবং মূল্য স্থিতিশীল রাখার উপায় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়।
সভায় স্বাগত বক্তব্যে এফবিসিসিআই প্রশাসক ব্যবসায়ীদের কাছে নিত্যপণ্যের মজুত, আমদানি ও বর্তমান মূল্য পরিস্থিতি সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট তথ্য আহ্বান করেন। সভায় উপস্থিত খুচরা ও পাইকারি ব্যবসায়ীরা জানান, চিনি, ভোজ্যতেল, ডাল, আটা ও ময়দাসহ অন্যান্য নিত্যপণ্যের চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলে বাজারে দাম বাড়ার সম্ভাবনা থাকে না।
তবে উৎপাদনমুখী কারখানাগুলোতে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত না করা গেলে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। মিল মালিকদের প্রতিনিধিরা জানান, বর্তমানে গ্যাস ও বিদ্যুতের তীব্র সংকটের কারণে উৎপাদন প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এই সংকট নিরসন এবং এলসি বা ঋণপত্র খোলার ক্ষেত্রে বিদ্যমান জটিলতাগুলো দ্রুত সমাধান করা না গেলে নিত্যপণ্যের বাজার স্থিতিশীল রাখা কঠিন হয়ে পড়বে।
তারা দাবি করেন, আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত চিনির দাম বাড়লেও দেশের বাজারে এখনো পণ্যটির দাম অপরিবর্তিত রাখা সম্ভব হয়েছে। মুক্ত আলোচনায় অংশ নিয়ে মৌলভীবাজার ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক গোলাম মাওলা বলেন, আমদানি প্রক্রিয়া এবং মিল পর্যায়ে উৎপাদন সচল না থাকলে বাজারে অস্থিরতা দেখা দিতে পারে। তিনি জ্বালানি সংকট নিরসন এবং এলসি সংক্রান্ত জটিলতার দ্রুত সমাধানের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
কাওরান বাজার কাঁচামাল আড়ত ব্যবসায়ী মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক সাইফুর রহমান সুজন দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে ফুটপাতের হকার এবং অনিবন্ধিত ব্যবসায়ীদের কঠোর তদারকির আওতায় আনার প্রস্তাব দেন। বাংলাদেশ সুপার মার্কেট অনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মো. জাকির হোসেন বলেন, সরবরাহ ব্যবস্থায় পণ্যের হাতবদল বা মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমাতে পারলে দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।
সভায় অংশ নেওয়া বিভিন্ন বণিক সমিতির নেতারা সরবরাহ ব্যবস্থার বিভিন্ন ধাপে হয়রানি বন্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হস্তক্ষেপ কামনা করেন। পাশাপাশি খুচরা ও পাইকারি বাজারসহ মিলগেটে পণ্যের মূল্য তদারকি আরও জোরদার করার দাবি জানান তারা। কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সাংগঠনিক সম্পাদক মো. আবুল কালাম আজাদ বলেন, সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য নিয়ন্ত্রণে সরকার ও বেসরকারি খাতকে আরও বেশি দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।
সভায় টিসিবি’র প্রতিনিধি জানান, ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে প্রায় ১ কোটি পরিবারের মাঝে স্বল্পমূল্যে পণ্য সরবরাহ করা হচ্ছে। খাদ্য অধিদপ্তরের প্রতিনিধি জানান, খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির আওতায় নিম্নআয়ের মানুষের মাঝে স্বল্পমূল্যে চাল বিতরণ করা হচ্ছে। তবে ব্যবসায়ীরা পরামর্শ দেন যে, দেশীয় কোম্পানি থেকে পণ্য সংগ্রহের পরিবর্তে টিসিবির নিজস্ব সক্ষমতা বাড়িয়ে সরাসরি পণ্য আমদানি বা বিকল্প উৎস থেকে সংগ্রহের ব্যবস্থা করা উচিত।
সমাপনী বক্তব্যে এফবিসিসিআই প্রশাসক মো. ফজলুল হক বলেন, সভায় ব্যবসায়ী নেতারা যেসব পরামর্শ দিয়েছেন তা লিপিবদ্ধ করে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে তুলে ধরা হবে। তিনি নতুন পে-স্কেলের প্রভাব যেন নিত্যপণ্যের বাজারে অযৌক্তিক হারে না পড়ে, সে বিষয়ে ব্যবসায়ীদের সহযোগিতা কামনা করেন। সভায় এফবিসিসিআইয়ের মহাসচিব মো. আলমগীরসহ বিভিন্ন চেম্বার ও অ্যাসোসিয়েশনের নেতৃবৃন্দ এবং বাণিজ্য, শিল্প ও খাদ্য মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
এছাড়া বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশন, প্রতিযোগিতা কমিশন, জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর ও নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের প্রতিনিধিরাও সভায় অংশ নেন।
