সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন বেতনকাঠামো ঘোষণার পর নিত্যপণ্যের দাম যেন কোনোভাবেই না বাড়ে, সেই বিষয়ে ব্যবসায়ীদের প্রতি কঠোর আহ্বান জানিয়েছে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার্স অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এফবিসিসিআই)। মঙ্গলবার রাজধানীর মতিঝিলে এফবিসিসিআই কার্যালয়ে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় সংগঠনের প্রশাসক মো. ফজলুল হক এই আহ্বান জানান।
সভায় ভোগ্যপণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি, বিভিন্ন খাতের ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতা, পাইকারি ও খুচরা ব্যবসায়ী এবং সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। এফবিসিসিআই প্রশাসক মো. ফজলুল হক সভায় বলেন, সরকারি বেতন স্কেল ঘোষণার পরপরই এই সভাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাজারে জিনিসপত্রের মূল্যবৃদ্ধির কারণে সাধারণ মানুষ এমনিতেই বেশ কষ্টে দিনাতিপাত করছেন।
এই পরিস্থিতিতে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়ার সুযোগ নিয়ে ব্যবসায়ীরা যেন চাল, ডাল ও তেলের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়িয়ে না দেন। তিনি ব্যবসায়ীদের উদ্দেশে বলেন, সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়লে হয়তো তারা বাড়তি দাম দেওয়ার সক্ষমতা অর্জন করবেন, কিন্তু দেশের অধিকাংশ মানুষ সরকারি চাকরি করেন না।
ফলে ব্যবসায়ীদের সামাজিক ও নৈতিক দায়িত্ব রয়েছে। বেতন বৃদ্ধির সুযোগ নিয়ে বাড়তি মুনাফা অর্জন বা কৃত্রিম সংকট তৈরি করে দাম বাড়ানো থেকে বিরত থাকার জন্য ব্যবসায়ীদের প্রতি তিনি বার্তা দেন। সোমবার সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে নতুন বেতনকাঠামো অনুমোদন দেওয়া হয়। নতুন এই কাঠামো অনুযায়ী, গ্রেডভেদে সরকারি চাকরিজীবীদের প্রারম্ভিক মূল বেতন ১০০ থেকে ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে।
এর মধ্যে ১ থেকে ১১ নম্বর গ্রেডের কর্মকর্তাদের মূল বেতন ১০০ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। এছাড়া ১২ থেকে ২০ নম্বর গ্রেড পর্যন্ত ১১৫ থেকে ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বেতন বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সভায় ব্যবসায়ীরা দেশের ভোগ্যপণ্য উৎপাদন ও সরবরাহ পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করেন। ব্যবসায়ীরা জানান, বর্তমানে দেশের ভোগ্যপণ্য উৎপাদনকারী বড় শিল্পগোষ্ঠীর সংখ্যা হাতে গোনা কয়েকটি।
এসব কোম্পানি উৎপাদনের পাশাপাশি কাঁচামাল আমদানি করে বাজারে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকটের কারণে পণ্য উৎপাদন ও সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটছে। এই সংকট নিরসনে যেকোনো মূল্যে কারখানাগুলো সচল রাখার দাবি জানান ব্যবসায়ীরা। মৌলভীবাজার ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক গোলাম মওলা সভায় বলেন, এক সময় দেশে ভোগ্যপণ্য উৎপাদনকারী ৩০ থেকে ৪০টি কোম্পানি ছিল, কিন্তু এখন মাত্র চার থেকে পাঁচটি টিকে আছে।
অনেক শিল্প গ্রুপ বন্ধ হয়ে গেছে। এর সঙ্গে গ্যাস ও বিদ্যুতের সমস্যা এবং বিভিন্ন আইনকানুনের জটিলতায় অনেক কারখানা উৎপাদনে আসতে পারছে না। তিনি আরও বলেন, রাতারাতি নতুন শিল্প গ্রুপ তৈরি করা সম্ভব নয়। তাই পাইকারি ব্যবসায়ীদের দাবি, বিদ্যমান কারখানাগুলোকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। অন্যথায় ভবিষ্যতে আমদানি, উৎপাদন ও সরবরাহে বড় ধরনের সংকট তৈরি হবে যা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়বে।
সভায় চিনির মূল্যবৃদ্ধির বিষয়টিও উঠে আসে। এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক মো. ফজলুল হক জানান, খুচরা পর্যায়ে চিনির দাম কেজিতে ১০ টাকা বেড়েছে। এ বিষয়ে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে কারণ জানতে চাইলে নিউমার্কেট বনলতা কাঁচাবাজার ব্যবসায়ী সমিতির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ শফিউল্লাহ জানান, পাইকারি বাজার থেকে বেশি দামে চিনি কিনতে হচ্ছে বলেই খুচরা বাজারে দাম বাড়ছে।
বাংলাদেশ চিনি ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি মো. আবুল হাশেম বলেন, গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকটের কারণে কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। বাজারে চাহিদার তুলনায় পণ্য কম আসায় দাম বাড়ছে। মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের জ্যেষ্ঠ উপমহাব্যবস্থাপক তসলিম শাহরিয়ার জানান, গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকটে উৎপাদন কমেছে এবং বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত চিনির দামও বেড়েছে।
তবে তিনি দাবি করেন, মিল পর্যায়ে চিনির দামে বড় কোনো সমস্যা নেই।
