লালমনিরহাট জেলায় চলতি মৌসুমে পাটের আবাদ লক্ষ্যমাত্রাকে ছাড়িয়ে গেলেও ফলন বিপর্যয়ের কারণে কৃষকরা চরম হতাশায় দিন কাটাচ্ছেন। মৌসুমের শুরুতে তীব্র খরা এবং পরবর্তীতে অতিবৃষ্টির কারণে পাটের উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি পাওয়ায় বর্তমান বাজারদরে পাট বিক্রি করে কৃষকদের মূলধন ওঠানোই কঠিন হয়ে পড়েছে।
একই সময়ে প্রতিবেশী দেশ ভারতে পাটের দাম বেশি হওয়ায় সীমান্তপথে পাট পাচারের প্রবণতা দেখা দিয়েছে, যা রোধ করতে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ বা বিজিবি কঠোর অবস্থানে রয়েছে। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে জেলায় চার হাজার ১০ হেক্টর জমিতে পাট চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল।
তবে কৃষকরা লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে চার হাজার ৪৫ হেক্টর জমিতে পাটের আবাদ করেছেন। তিস্তা ও ধরলা নদীর চরাঞ্চলসহ জেলার পাঁচটি উপজেলায় তোষা, দেশি ও ক্যানাফ জাতের পাটের ব্যাপক চাষাবাদ হয়েছে। কিন্তু মৌসুমের শুরুতেই বৃষ্টির অভাব দেখা দেওয়ায় কৃষকদের শ্যালো মেশিন ব্যবহার করে জমিতে সেচ দিতে হয়েছে, যা উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে দিয়েছে।
এরপর টানা অতিবৃষ্টি ও রোগবালাইয়ের আক্রমণে পাটের স্বাভাবিক বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হয়। জলাবদ্ধতার কারণে গাছের বৃদ্ধি থমকে যাওয়ায় ফলন আশানুরূপ হয়নি। কৃষকদের বাধ্য হয়ে দফায় দফায় কীটনাশক প্রয়োগ করতে হয়েছে, যা তাদের আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। বর্তমানে অধিকাংশ কৃষক পাট কাটা, জাগ দেওয়া এবং আঁশ ছাড়ানোর কাজ সম্পন্ন করেছেন।
স্থানীয় হাটবাজারগুলোতে মানভেদে প্রতি মণ পাট তিন হাজার থেকে সাড়ে চার হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। দাম কিছুটা ভালো মনে হলেও ফলন কম হওয়ায় কৃষকরা লাভের মুখ দেখছেন না। স্থানীয় চাষি এনামুল ইসলাম জানান, শুরুতে সেচের খরচ এবং পরে অতিবৃষ্টির কারণে পাটের গাছ লম্বা হয়নি, ফলে আঁশও মানসম্মত হয়নি।
আরেক চাষি আব্দুল আহাদ জানান, রোগবালাই ও প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে উৎপাদন খরচ তোলাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এদিকে, জেলার সদর, আদিতমারী ও পাটগ্রাম উপজেলার সীমান্ত এলাকা দিয়ে অসাধু চক্র ভারতে পাট পাচারের চেষ্টা চালাচ্ছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, ভারতে পাটের দাম বেশি হওয়ার সুযোগ নিয়ে চোরাকারবারিরা সক্রিয় হয়ে উঠেছে।
এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিজিবি সীমান্তে নজরদারি জোরদার করেছে। গত ২৮ আগস্ট আদিতমারীর বানিয়াটারী সীমান্ত দিয়ে পাচারের সময় বিজিবি ৪৬০ কেজি বাংলাদেশি পাট জব্দ করে। এর আগে ২৩ আগস্ট পাটগ্রামের পানবাড়ী কলসিপাড়া সীমান্ত থেকে ৪০০ কেজি পাটসহ একটি অটোভ্যান জব্দ করা হয়। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক মো. মতিউল আলম জানান, আবাদ লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে গেলেও অতিবৃষ্টির কারণে এবার পাটের ফলন কিছুটা কম হয়েছে।
সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়ে লালমনিরহাট ১৫ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মেহেদী ইমাম জানান, পাটসহ যেকোনো ধরনের সীমান্ত চোরাচালান রোধে বিজিবির টহল ও গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। চোরাকারবারিদের তৎপরতা বন্ধে বিজিবি জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করছে এবং সীমান্তে নিয়মিত টহল অব্যাহত রয়েছে। কৃষকদের এই ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে এবং পাচার রোধে স্থানীয় প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নজর রাখছে।
