ইউক্রেন যুদ্ধের অবসানের জন্য রাশিয়ার সঙ্গে জ্বালানি বাণিজ্য বন্ধ করা কোনো সমাধান নয় বলে মন্তব্য করেছেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর। ইউক্রেন সফরকালে দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্দ্রি সিবিহার সঙ্গে বৈঠকের পর সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে তিনি এই অবস্থান তুলে ধরেন। জয়শঙ্কর স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, কোনো দেশ তেল, অ্যালুমিনিয়াম, খনিজ, ধাতু কিংবা সার কিনছে কি না, তার ওপর যুদ্ধের সমাধান নির্ভর করে না।
দীর্ঘস্থায়ী এই সংঘাত নিরসনে সংলাপ, কূটনীতি এবং আলোচনার পথেই এগোতে হবে বলে তিনি মত প্রকাশ করেন। ভারতের ১৪০ কোটি মানুষের জ্বালানি চাহিদা মেটানো একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ভারত ইউক্রেনের অবস্থানকে সম্মান করে এবং একইভাবে ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক অবস্থানকেও অন্যদের সম্মান করা উচিত।
ইউক্রেন যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে রাশিয়ার জ্বালানি বাণিজ্য থেকে আয় কমিয়ে মস্কোর অর্থনৈতিক সক্ষমতা দুর্বল করার লক্ষ্যে পশ্চিমা দেশগুলো ক্রমাগত চাপ দিয়ে আসছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যসহ পশ্চিমা দেশগুলোর দাবি, রাশিয়ার তেল ও গ্যাস আমদানি বন্ধ করলে যুদ্ধের অর্থনৈতিক ভিত্তি দুর্বল হবে। এই প্রেক্ষাপটে মার্কিন সিনেটে একটি দ্বিদলীয় বিল পাস হয়েছে, যেখানে রাশিয়ার তেল ও গ্যাস আমদানি অব্যাহত রাখা দেশগুলোর পণ্যের ওপর সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের ক্ষমতা প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।
তবে এসব চাপের মুখেও ভারত তার জ্বালানি আমদানির নীতিতে অটল রয়েছে। ২০২২ সালে ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর আগে ভারতের মোট অপরিশোধিত তেল আমদানিতে রাশিয়ার অংশ ছিল মাত্র শূন্য দশমিক ২ শতাংশ। কিন্তু যুদ্ধের পর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কারণে বিশ্ববাজারে রুশ তেলের সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আসে এবং ভারত তুলনামূলক কম দামে রুশ তেল কেনার সুযোগ গ্রহণ করে।
বর্তমানে ভারত তার প্রয়োজনীয় অপরিশোধিত তেলের প্রায় ৮৮ শতাংশ বিদেশ থেকে আমদানি করে, যার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ আসে রাশিয়া থেকে। সামুদ্রিক গোয়েন্দা প্রতিষ্ঠান কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, আগস্ট মাসে ভারত প্রতিদিন প্রায় ২১ লাখ ব্যারেল রুশ অপরিশোধিত তেল আমদানি করেছে। যদিও জুন ও জুলাই মাসে এই আমদানির পরিমাণ ছিল দৈনিক প্রায় ২৬ লাখ ব্যারেল।
আগস্টে আমদানির পরিমাণ কিছুটা কমলেও ভারতের মোট অপরিশোধিত তেল আমদানির ৪০ শতাংশের বেশি রাশিয়া থেকে এসেছে। ইউরোপীয় দেশগুলোর নিষেধাজ্ঞার পর রাশিয়ার তেল রপ্তানির ক্ষেত্রে ভারত ও চীনের মতো এশীয় ক্রেতাদের গুরুত্ব দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে। পশ্চিমা দেশগুলোর জাহাজ, বিমা ও আর্থিক সেবার বিধিনিষেধ থাকা সত্ত্বেও এশিয়ার বাজার রাশিয়ার জ্বালানি রপ্তানির প্রধান বিকল্প হয়ে উঠেছে।
ভারতীয় পরিশোধনাগারগুলোর ধারাবাহিক চাহিদা রাশিয়ার তেল রপ্তানির পরিমাণ ধরে রাখতে সহায়তা করছে। পশ্চিমা দেশগুলো যেখানে রাশিয়ার জ্বালানি আয় কমিয়ে যুদ্ধের অর্থনৈতিক ভিত্তি দুর্বল করতে চাইছে, সেখানে ভারত তার নিজস্ব জ্বালানি নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক প্রয়োজনকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে। রাশিয়ার কাছ থেকে অপরিশোধিত তেল আমদানি কমানোর বিষয়ে পশ্চিমা দেশগুলোর সম্ভাব্য নিষেধাজ্ঞা ও শুল্ক আরোপের পরিকল্পনার বিপরীতে ভারত তার বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক অবস্থান বজায় রাখার নীতিতে অটল রয়েছে।
সামগ্রিকভাবে, রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের তেল বাণিজ্য শুধু একটি বাণিজ্যিক লেনদেন নয়, বরং এটি ভারতের বৃহত্তর জ্বালানি নিরাপত্তা ও ভূ-রাজনৈতিক কৌশলের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
