ময়মনসিংহের গফরগাঁও উপজেলার পোড়াবাড়িয়া গ্রামে গড়ে ওঠা পরচুলা তৈরির কারখানাগুলো স্থানীয় নারীদের কর্মসংস্থানের নতুন পথ তৈরি করেছে। পিবাড়িয়া গ্রুপের উদ্যোগে পরিচালিত এই কারখানাগুলোতে বর্তমানে কয়েক হাজার নারী কাজ করছেন, যা তাঁদের আর্থিক অবস্থার উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। স্থানীয়ভাবে ফেলে দেওয়া চুল সংগ্রহ করে তা প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে তৈরি করা হচ্ছে আন্তর্জাতিক মানের পরচুলা।
এই শিল্প এখন দেশের রপ্তানি খাতেও অবদান রাখছে। শিরিন আক্তার নামের একজন নারী শ্রমিক জানান, স্বামীর অসুস্থতা ও ঋণের চাপে দিশেহারা অবস্থায় তিনি ২০২২ সালের নভেম্বরে ‘হেয়ার কোট’ নামের এই কারখানায় যোগ দেন। শুরুতে মাসে ছয় হাজার টাকা আয় করলেও বর্তমানে তাঁর মাসিক আয় আট থেকে নয় হাজার টাকায় দাঁড়িয়েছে।
তাঁর মতো আরও অনেক নারী এখন নিজেদের উপার্জনে সংসারের হাল ধরেছেন। কারখানার তথ্য অনুযায়ী, পোড়াবাড়িয়া ছাড়াও ঘাগড়া, উথুরী, বাসুতিয়া, মহিরখারুয়া, মশাখালী, বাঘবাড়ি, মাইজবাড়ি, লংগাইর, কান্দিপাড়া, বাঘেরগাঁও, দিয়ারগাঁও, উস্থি, লামকাইন ও পাঁচবাগসহ মোট ১৫টি গ্রামের নারীরা এই কর্মযজ্ঞের সঙ্গে যুক্ত। শ্রমিকদের যাতায়াতের সুবিধার্থে কারখানা কর্তৃপক্ষ নিজস্ব পরিবহনের ব্যবস্থা রেখেছে।
পিবাড়িয়া গ্রুপ ২০০৭ সালে পোড়াবাড়িয়ায় প্রথম কারখানাটি চালু করে। বর্তমানে তাদের অধীনে ১৮টি কারখানা পরিচালিত হচ্ছে, যার মধ্যে ময়মনসিংহে সাতটি, ঢাকায় ছয়টি, কিশোরগঞ্জে দুটি এবং শেরপুর, জামালপুর ও নীলফামারীতে একটি করে কারখানা রয়েছে। এসব কারখানায় মোট ১ হাজার ৮৩০ জন শ্রমিক কাজ করছেন, যার ৯০ শতাংশই নারী।
কারখানাগুলোতে মাসে প্রায় এক হাজার কেজি চুল ব্যবহার করে পরচুলা তৈরি করা হয়। একটি পরচুলা তৈরিতে শ্রমিকের দক্ষতার ওপর ভিত্তি করে এক থেকে চার দিন পর্যন্ত সময় লাগে। মানভেদে প্রতিটি পরচুলা তৈরিতে ২ হাজার থেকে ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ হয়। আন্তর্জাতিক বাজারে এই পরচুলা ২২ ডলার থেকে শুরু করে ৪০০ ডলার পর্যন্ত দামে বিক্রি হয়।
যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ভারত, আফগানিস্তান, আজারবাইজান, চিলি, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মিসর, জার্মানি, ইতালি, জাপান, মাল্টা, নেপাল, ওমান, পাকিস্তান, কুয়েত, সৌদি আরব, পোল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, শ্রীলঙ্কা, তুরস্ক ও ইয়েমেনসহ ২২টি দেশে এই পণ্য রপ্তানি করা হচ্ছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় বাজার হলো যুক্তরাষ্ট্র। বর্তমানে বছরে প্রায় ২০ লাখ মার্কিন ডলার বা প্রায় ২৪ কোটি টাকার পরচুলা রপ্তানি হচ্ছে।
গফরগাঁও উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা খালেদা আক্তার জানান, প্রতিষ্ঠানটি নারীদের কাজ শেখানোর পাশাপাশি কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করছে। নারীরা কারখানায় এসে অথবা বাড়িতে বসেও কাজ করার সুযোগ পাচ্ছেন, যা তাঁদের আত্মনির্ভরশীল করে তুলছে। শ্রমিকদের মজুরি নির্ধারিত হয় কাজের পরিমাণের ওপর ভিত্তি করে। আকারভেদে একটি পরচুলা তৈরির জন্য ১ হাজার ১০০ থেকে ৩ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত মজুরি পাওয়া যায়।
সাথী আক্তার ও মাফিয়া আক্তারের মতো অনেক নারী শ্রমিক জানিয়েছেন, এই আয়ের মাধ্যমে তাঁরা নিজেদের প্রয়োজনীয় চাহিদা পূরণ করছেন এবং পরিবারের সচ্ছলতা ফিরিয়ে এনেছেন। পিবাড়িয়া গ্রুপের চেয়ারম্যান মো. নুরুজ্জামান জানান, দক্ষিণ কোরিয়ার একটি কোম্পানির কারখানা দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি ২০০৭ সালে নিজ গ্রামে ২০ লাখ টাকা বিনিয়োগে এই উদ্যোগ শুরু করেন।
তাঁর লক্ষ্য ছিল স্থানীয় পর্যায়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা। বর্তমানে প্রায় দুই হাজার মানুষ এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত। নুরুজ্জামান আরও জানান, ভবিষ্যতে আরও ১০ হাজার নারীর কর্মসংস্থান তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। তবে কাঁচামাল আমদানি সহজ করা, পরিবহন খরচ কমানো এবং নতুন বাজার অনুসন্ধানে সরকারি সহযোগিতা পেলে এই শিল্প দেশের অন্যতম প্রধান রপ্তানি খাত হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে বলে তিনি মনে করেন।
চুলের মান ও দৈর্ঘ্য অনুযায়ী বাছাইয়ের পর তা পরিষ্কার, জীবাণুমুক্ত ও রং করা হয়। এরপর ‘নটিং’ পদ্ধতির মাধ্যমে অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে ক্যাপের সঙ্গে চুলগুলো গিঁট দিয়ে বসানো হয়, যা কারখানার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ। গ্রামীণ নারীদের এই অংশগ্রহণ স্থানীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে এবং জীবনযাত্রার মান পরিবর্তনে সহায়ক হচ্ছে।
