বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকের পর মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার নতুন করে উন্মুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। দুই দেশের সরকারের উদ্যোগে বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরুর উদ্যোগ নেওয়া হলেও, এরই মধ্যে সক্রিয় হয়ে উঠেছে একটি দালাল চক্র। ‘কলিং ভিসা’, ‘কোটা’, ‘ভিসা রেডি’ কিংবা ‘মালয়েশিয়ার কোম্পানির কাজ’—এমন নানা আকর্ষণীয় শব্দ ব্যবহার করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চলছে ব্যাপক প্রচার।
এসব প্রলোভন দেখিয়ে সম্ভাব্য কর্মীদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। দুই দেশের যৌথ ঘোষণায় নতুন কর্মী নিয়োগে কোনো মধ্যস্বত্বভোগীর সুযোগ থাকবে না বলে স্পষ্ট করা হলেও, মাঠ পর্যায়ে এর প্রতিফলন নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, আগের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়ার কথা বলা হলেও দালাল ও মধ্যস্বত্বভোগীদের তৎপরতা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।
মালয়েশিয়ার নির্ধারিত পদ্ধতি অনুযায়ী, দেশটির নিয়োগকর্তাকে বাংলাদেশে অনুমোদিত ২৬টি রিক্রুটিং এজেন্সির মধ্য থেকে পছন্দ করতে হবে এবং নিয়োগকর্তা এসব এজেন্সির মাধ্যমে সরাসরি কর্মী বাছাই করবেন। কিন্তু বাস্তবে এসব মৌলিক তথ্যের বদলে সম্ভাব্য কর্মীদের কাছে ঘুরছে ‘ভিসা’, ‘কোটা’ ও ‘ডিমান্ড’ কেনাবেচার খবর। মালয়েশিয়ায় কর্মী নিয়োগের ভিসাকে বাংলাদেশি মধ্যস্বত্বভোগীরা দীর্ঘদিন ধরে ‘কলিং ভিসা’ নামে পরিচিত করে তুলেছেন।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ‘কয়টা মাথা’, ‘কয়টা বডি’, ‘কয়টা যাত্রী’ কিংবা ‘কয়টা পাসপোর্ট’-এর মতো অমানবিক শব্দ। শ্রম অভিবাসন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একজন কর্মী কোনো পণ্য নন যে তাকে ‘বডি’ বা ‘পাসপোর্ট’ হিসেবে গণনা করা হবে। কিন্তু পুরো প্রক্রিয়ায় মানুষের পরিবর্তে সংখ্যা ও টাকার হিসাবই যেন বড় হয়ে উঠেছে।
এতে কর্মীর অধিকার ক্ষুণ্ন হওয়ার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে বাংলাদেশের ভাবমূর্তিও প্রশ্নের মুখে পড়ছে। বর্তমান সরকার বিদেশে কর্মসংস্থানে প্রতারণা ও অতিরিক্ত অর্থ আদায় ঠেকাতে বিনামূল্যে বা স্বল্প ব্যয়ে কর্মী পাঠানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সরকারি রিক্রুটিং এজেন্সি বোয়েসেলের মাধ্যমে ১০ হাজার কর্মীকে কোনো ধরনের অর্থ ব্যয় ছাড়াই মালয়েশিয়ায় পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
তবে বেসরকারি রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে যাওয়া কর্মীদের ক্ষেত্রেও একই নীতি কার্যকর হবে কি না, তা নিয়ে বড় চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। অতীতে বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগকে কেন্দ্র করে অতিরিক্ত অর্থ আদায় ও মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্যের অভিযোগে মালয়েশিয়াকে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছিল। বিএমইটির সূত্র অনুযায়ী, লাইসেন্সধারী রিক্রুটিং এজেন্সির হয়ে অনেক ক্ষেত্রে দালালরাই কর্মী সংগ্রহ থেকে শুরু করে বিমানবন্দরে তুলে দেওয়া পর্যন্ত কাজ করে।
ফলে বিদেশে থাকা কর্মীরা অনেক সময় এজেন্সির নাম বলতে পারেন না, তারা শুধু দালালের নামই জানেন। প্রতিষ্ঠিত রিক্রুটিং এজেন্সির কর্মকর্তাদের ভাষ্য, গ্রামের অনেক যুবক শুরুতেই দালালের কাছে পাসপোর্ট দিয়ে দেন এবং টাকা-পয়সার দরদাম সেখানেই ঠিক হয়। পাসপোর্ট দালালের হাতে থাকায় বৈধ রিক্রুটিং এজেন্সি চাইলেও সরাসরি কর্মী সংগ্রহ করতে পারে না।
অভিবাসন নিয়ে কাজ করা সংস্থা ওকাপের গবেষণায় দেখা গেছে, তুলনামূলক কম শিক্ষিত এবং প্রস্তুতিহীন ব্যক্তিরাই দালালের মাধ্যমে বেশি অর্থ ব্যয় করেন এবং প্রতারণার শিকার হন। অন্যদিকে, সচেতন ও দক্ষ কর্মীরা বৈধ প্রক্রিয়ায় তুলনামূলক কম খরচে যেতে পারেন। নতুন ব্যবস্থায় কৃত্রিম বাছাই বা অর্থের বিনিময়ে কর্মীকে কোনো নিয়োগকর্তার কাছে চাপিয়ে দেওয়ার সুযোগ না রাখার কথা বলা হয়েছে।
প্রযুক্তিনির্ভর পদ্ধতিতে নিয়োগকর্তা সরাসরি কর্মীর সাক্ষাৎকার নিয়ে তাকে নির্বাচন করবেন। এ কারণে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় বারবার সতর্ক করছে যে, চূড়ান্ত নিয়োগ নিশ্চিত হওয়ার আগে কোনো ধরনের আর্থিক লেনদেন, পাসপোর্ট হস্তান্তর কিংবা অপ্রয়োজনীয় মেডিকেল পরীক্ষায় না যেতে। নিয়োগকর্তা শেষ পর্যন্ত কর্মী নির্বাচন না করলে আগাম দেওয়া টাকা ফেরত পাওয়ার নিশ্চয়তা এখনো অস্পষ্ট।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রকৃত নিয়োগকর্তা, অনুমোদিত কোটা, বেতন, কর্মক্ষেত্র, রিক্রুটিং এজেন্সি এবং মোট অভিবাসন ব্যয়ের তথ্য কর্মীর কাছে স্বচ্ছভাবে পৌঁছে দেওয়া এখন সবচেয়ে জরুরি। একই সঙ্গে অননুমোদিত দালাল ও মধ্যস্বত্বভোগীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। নিরাপদ কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে মন্ত্রণালয় নিকটস্থ ডেমো অফিস বা টেকনিক্যাল ট্রেনিং সেন্টারের সঙ্গে যোগাযোগ করার পরামর্শ দিয়েছে।
এখন দেখার বিষয়, সরকারের ঘোষণা অনুযায়ী মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর নতুন অধ্যায় সত্যিই মধ্যস্বত্বভোগীমুক্ত ও স্বচ্ছ হয় কি না।
