ভারতে অ্যাভোকাডো চাষের জনপ্রিয়তা দ্রুত বাড়ছে। এক সময় যে ফলটি অবহেলায় পড়ে থাকত এবং কুকুর খেত, বর্তমানে সেই অ্যাভোকাডোই ভারতের কৃষকদের কাছে একটি লাভজনক বাণিজ্যিক ফসলে পরিণত হয়েছে। ভারতের বাণিজ্যিক কৃষিকাজে ২৬ বছর ধরে যুক্ত সুনীল বোপাইয়া জানান, ১৫ বছর আগেও ভারতে অ্যাভোকাডোর তেমন কোনো বাজার ছিল না।
কেরালা রাজ্যের ওয়ানাড়ের পাহাড়ি এলাকায় অবস্থিত কটানাড প্ল্যান্টেশনসের গ্রুপ ম্যানেজার হিসেবে তিনি কাজ করেন। প্রতিষ্ঠানটি আগে কফিবাগানে ছায়া দেওয়ার জন্য অ্যাভোকাডো গাছ রোপণ করত। তবে ২০১১ সালের দিকে বলিউড তারকা শিল্পা শেঠি ত্বকের যত্নে এই ফলের ব্যবহারের কথা উল্লেখ করলে বাজারে এর চাহিদা রাতারাতি বেড়ে যায়।
সুনীল বোপাইয়ার মতে, এরপর থেকেই অ্যাভোকাডোর দাম বাড়তে শুরু করে এবং এটি কৃষকদের জন্য একটি লাভজনক ব্যবসায় পরিণত হয়। বর্তমানে কটানাড প্ল্যান্টেশনস ৪০ একর জমিতে অ্যাভোকাডো চাষ করছে। গত বছর তারা ১০ থেকে ১৫ টন ফল সংগ্রহ করেছে এবং আগামী তিন থেকে চার বছরের মধ্যে উৎপাদন ৪০ থেকে ৫০ টনে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।
ভারতে অ্যাভোকাডোর চাহিদার তুলনায় স্থানীয় উৎপাদন এখনো কম। দেশটিতে প্রতিবছর প্রায় ১৫ হাজার টন অ্যাভোকাডো আমদানি করা হয়, বিপরীতে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত হয় মাত্র ৮ থেকে ৯ হাজার টন। কৃষি বিশেষজ্ঞ মণিলাল পাল্লিয়াথ জানান, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে কফি ও গোলমরিচের মতো প্রচলিত ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় কৃষকদের ফসলের বৈচিত্র্য আনা জরুরি হয়ে পড়েছে।
তিনি মনে করেন, অ্যাভোকাডো চাষ কৃষকদের জন্য বড় সুযোগ তৈরি করতে পারে। তবে স্থানীয় উৎপাদনে মান ও সরবরাহের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা এখনো একটি বড় চ্যালেঞ্জ। মুম্বাইয়ের নির্বাহী শেফ হসেইন শাহজাদ জানান, স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত অ্যাভোকাডোর মান উন্নত হচ্ছে, তবে অঞ্চলভেদে এর গুণগত মানে পার্থক্য দেখা যায়।
এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কিছু উদ্যোক্তা ইসরায়েলি প্রযুক্তি গ্রহণ করছেন। ভোপালের ইন্দো-ইসরায়েল অ্যাভোকাডো নার্সারির প্রতিষ্ঠাতা হর্ষিত গোদা ২০২১ সালে এই ব্যবসা শুরু করেন। তিনি ইসরায়েলে গিয়ে উন্নত চাষ পদ্ধতি শিখে এসেছেন এবং গত পাঁচ বছরে ভারতের কৃষকদের কাছে প্রায় ১৮ হাজার চারা সরবরাহ করেছেন। হর্ষিত জানান, বাণিজ্যিক বাগান গড়ে তোলার জন্য উন্নত রুটস্টক, নিয়মিত ছাঁটাই এবং সঠিক পরাগায়ন নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।
তিনি আরও বলেন, সঠিক প্রযুক্তি ও সেচ ব্যবস্থা ছাড়া কাঙ্ক্ষিত ফলন পাওয়া সম্ভব নয়। এদিকে, স্থানীয় জাত উন্নয়নের জন্য কাজ করছে বেঙ্গালুরুর আইসিএআর-ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব হর্টিকালচারাল রিসার্চ। প্রধান বিজ্ঞানী ড. গণেশন কারুনাকরণ জানান, ভারতের বিভিন্ন বাড়িতে থাকা অ্যাভোকাডো গাছগুলো জিনগতভাবে আলাদা, যা বাজারে মানের তারতম্য তৈরি করে।
তিনি স্থানীয় গাছের বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে ইতিমধ্যে দুটি উন্নত জাত উদ্ভাবন করেছেন। কৃষকদের মধ্যেও এই ফল চাষের আগ্রহ বাড়ছে। কেরালার কৃষক শিজু সেবাস্টিয়ান আট বছর আগে দুই একর জমিতে অ্যাভোকাডো চাষ শুরু করেন। এ বছর তিনি ৩ হাজার ৫০০ কেজি ফল উৎপাদন করেছেন। শিজু জানান, অ্যাভোকাডো চাষে তিনি দারুণ সম্ভাবনা দেখছেন এবং নিজের খামারে আরও তিন একর জমিতে এই ফলের চাষ বাড়ানোর পরিকল্পনা করছেন।
সঠিক দিকনির্দেশনা ও নিশ্চিত বাজার পেলে অ্যাভোকাডো ভারতের কৃষিখাতে বড় পরিবর্তন আনতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
