জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) জানিয়েছে যে, রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে চলমান সংঘাতের ফলে বিশ্ববাজারে খাদ্যপণ্যের দাম আরও বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এই সংঘাতের প্রভাবে বিশেষ করে কৃষ্ণসাগরে জাহাজ ও বন্দরের অবকাঠামোয় হামলা চালানো হচ্ছে, যা গুরুত্বপূর্ণ শস্য রপ্তানি ব্যাহত করছে।
এফএও-র তথ্য অনুযায়ী, বিশ্ববাজারে খাদ্যের দাম এখন সাড়ে তিন বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। আগস্ট মাসে এই সূচকের গড় মান ১৩৩ দশমিক ৩ পয়েন্টে উঠেছে, যা ২০২২ সালের নভেম্বরের পর সর্বোচ্চ পর্যায়।
সংঘাত তীব্র হওয়ার কারণে জুলাই মাসে কৃষ্ণসাগরে যত নাবিক নিহত হয়েছেন, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত কোনো মাসে এত বেশি নাবিক নিহত হননি। এর ফলে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য কৃষ্ণসাগর এখন বিশ্বের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ জলপথ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
তুরস্কের নাবিকদের ইউনিয়ন তুর্কিয়ে দেনিজচিলের সেনদিকাসির হিসাব অনুযায়ী, জুলাই মাসে কৃষ্ণসাগরে ৩৫টি জাহাজে হামলার ঘটনায় ২৩ জন নাবিক নিহত হয়েছেন। এছাড়া আগস্ট মাসেও জাহাজে হামলা অব্যাহত ছিল।
জাতিসংঘের নৌপরিবহন সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল মেরিটাইম অর্গানাইজেশনের (আইএমও) প্রধান জানিয়েছেন যে, বিশ্বজুড়ে সমুদ্রপথের নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে।
২০২২ সালে যুদ্ধ শুরুর কয়েক মাস পর রাশিয়া ইউক্রেনের বন্দরগুলোতে এবং নোঙর করে থাকা জাহাজগুলোতে হামলা চালিয়েছিল, যার ফলে কিয়েভের শস্য রপ্তানি বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। গত জুলাই মাসে রাশিয়া আবারও ইউক্রেনের প্রধান শস্য রপ্তানি কেন্দ্র ওদেসা ও চর্নোমর্স্ক বন্দরে হামলা চালিয়েছে।
অন্যদিকে, ইউক্রেনও রুশ জাহাজে ড্রোন হামলা চালিয়েছে। কিয়েভের দাবি, এই জাহাজগুলো রাশিয়ার ‘ছায়া নৌবহরের’ অংশ এবং নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে তেল রপ্তানির জন্য ব্যবহৃত হয়। ইউক্রেন রাশিয়ার কৃষ্ণসাগরীয় বন্দর নভোরোসিস্কেও হামলা চালিয়েছে, যা তেল ও শস্য রপ্তানির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বন্দর।
সামুদ্রিক ঝুঁকি বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান ভ্যানগার্ডের বিশ্লেষকরা জানিয়েছেন যে, এই অঞ্চলে জাহাজ চলাচলের ঝুঁকি অনেক বেড়েছে। তাদের মতে, হামলা এখন শুধু বন্দরের আশপাশে সীমাবদ্ধ নেই, বরং কৃষ্ণসাগরের আরও বিস্তৃত এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে।
এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণে রাশিয়া ও ইউক্রেনের শস্য রপ্তানি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। এর ফলে গম, যব ও ভুট্টা আমদানিনির্ভর দেশগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
রাশিয়া বিশ্বের সবচেয়ে বড় শস্য রপ্তানিকারক দেশ এবং তাদের শস্যের বড় অংশ মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার দেশগুলোতে, বিশেষ করে তুরস্ক ও মিসরে যায়। ইউক্রেন শস্য রপ্তানিতে বিশ্বে পঞ্চম স্থানে রয়েছে।
অক্সফোর্ড ইকোনমিকসের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, রাশিয়ার সমুদ্রপথে শস্য রপ্তানির ৭০ শতাংশের বেশি কৃষ্ণসাগরের বন্দর দিয়ে হয় এবং প্রায় ২০ শতাংশ আজভ সাগর দিয়ে হয়।
অক্সফোর্ড ইকোনমিকসের উদীয়মান বাজারবিষয়ক প্রধান অর্থনীতিবিদ তাতিয়ানা অরলোভা জানিয়েছেন যে, আগস্ট মাসে রাশিয়ার শস্য রপ্তানি তাদের স্বাভাবিক সক্ষমতার মাত্র ৪০ শতাংশে নেমে এসেছে।
ইউক্রেন এ বছর বাম্পার শস্য উৎপাদন করেছে, তবে কৃষ্ণসাগরের বন্দর দিয়ে রপ্তানি করতে পারছে না। ইউক্রেনের খাদ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন যে, সমুদ্র, রেল, নদী ও সড়কপথ মিলিয়ে দেশটি যতটা শস্য রপ্তানি করতে পারত, তার মাত্র এক-তৃতীয়াংশ রপ্তানি করতে পেরেছে।
বিশ্লেষকরা জানিয়েছেন যে, সমুদ্রপথে শস্য রপ্তানির এই বিঘ্ন এবং ইরান যুদ্ধ, ইউরোপের প্রচণ্ড গরম এবং এল নিনো পরিস্থিতির কারণে বিশ্ববাজারে খাদ্যের দাম আরও বাড়তে পারে।
অক্সফোর্ড ইকোনমিকসের খবর অনুযায়ী, চলতি বছর বিশ্বে খাদ্যের দাম প্রায় ১২ শতাংশ বাড়তে পারে এবং ২০২৭ সালে আরও ৪ দশমিক ৮ শতাংশ বৃদ্ধির সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে তাতিয়ানা অরলোভা মনে করেন যে, ২০২২ সালের মতো পরিস্থিতি এবার হবে না, কারণ অনেক খাদ্য আমদানিকারক দেশ এখন শস্য মজুত করে রেখেছে। তবে তিনি স্পষ্ট করে জানিয়েছেন যে, এই পরিস্থিতির প্রভাব খাদ্যের দামে অবশ্যই পড়বে।
