হরমুজ প্রণালিতে এলএনজি পরিবহন ব্যবস্থা এখনো স্বাভাবিক না হওয়ায় বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের জন্য তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি সরবরাহে চুক্তিগত দায়মুক্তির সময়সীমা বা ফোর্স মেজর আরও কয়েক সপ্তাহ বাড়িয়েছে কাতারের রাষ্ট্রীয় জ্বালানি প্রতিষ্ঠান কাতারএনার্জি। গত ২৮ আগস্ট কাতারএনার্জি বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের ক্রেতাদের জানিয়েছে যে, অক্টোবর মাস পর্যন্ত এলএনজি কার্গো বাতিলের এই প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকবে।
হরমুজ প্রণালিতে এলএনজি পরিবহনের ক্ষেত্রে সৃষ্ট দীর্ঘস্থায়ী স্থবিরতার কারণে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। যদিও সাম্প্রতিক সময়ে ওই একই রুট দিয়ে অপরিশোধিত তেল পরিবহন কিছুটা বৃদ্ধি পেয়েছে, কিন্তু এলএনজি পরিবহনের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি এখনো অপরিবর্তিত রয়েছে। কাতারএনার্জির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এলএনজি পরিবহনের ক্ষেত্রে তেল পরিবহনের মতো বিকল্প পদ্ধতি বা শিপ-টু-শিপ ট্রান্সফার প্রযুক্তি ব্যবহার করা সম্ভব নয়।
ফলে হরমুজ প্রণালির সংকট সরাসরি কাতারের এলএনজি রপ্তানি কার্যক্রমকে বাধাগ্রস্ত করছে। কেবল বাংলাদেশ বা পাকিস্তান নয়, ইউরোপের দেশগুলোর ক্ষেত্রেও এই সংকট প্রভাব ফেলেছে। ইতালির জ্বালানি প্রতিষ্ঠান এডিসন জানিয়েছে, তাদের জন্য নির্ধারিত এলএনজি সরবরাহের ফোর্স মেজর এবং কার্গো বাতিলের সময়সীমা নভেম্বরের শুরুর দিক পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে।
জুলাই মাসের শেষ দিকে এডিসন জানিয়েছিল যে, কাতারএনার্জি তাদের তিনটি এলএনজি কার্গো বাতিল করেছে এবং ফোর্স মেজরের সময়সীমা সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বর্ধিত করেছে। ২৮ জুলাই পর্যন্ত হিসাব অনুযায়ী, এডিসনের জন্য নির্ধারিত মোট ২৪টি এলএনজি কার্গো এই ফোর্স মেজরের আওতায় পড়েছে, যার সম্মিলিত পরিমাণ প্রায় ৩০০ কোটি ঘনমিটার প্রাকৃতিক গ্যাস।
এখন সেই সময়সীমা সেপ্টেম্বরের পরও বর্ধিত করা হলো। হরমুজ প্রণালিতে এলএনজি পরিবহন কার্যত স্থবির হয়ে পড়ার কারণে কাতার বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। বিভিন্ন তথ্য ও পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এই সংকটের ফলে কাতার প্রায় ২৪ বিলিয়ন ডলার সমমূল্যের বিক্রয়মূল্য হারিয়েছে। চলতি সপ্তাহের শুরুতে করা হিসাব অনুযায়ী, কাতারের এলএনজি রপ্তানি সর্বোচ্চ ৯৬ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পেয়েছে।
তথ্য বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান আইসিস-এর তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের একই সময়ের তুলনায় কাতার থেকে এলএনজি কার্গো পাঠানোর হার নাটকীয়ভাবে কমেছে। গত বছর এই সময়ে কাতার থেকে ৫০৯টি এলএনজি কার্গো পাঠানো হয়েছিল, কিন্তু চলতি সময়ে এখন পর্যন্ত মাত্র ১৮টি কার্গো রপ্তানি করা সম্ভব হয়েছে। পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের অন্যান্য জ্বালানি উৎপাদনকারী দেশগুলো বিকল্প রুট বা পদ্ধতি ব্যবহার করে তেল ক্রেতাদের কাছে পৌঁছে দিতে পারলেও এলএনজির ক্ষেত্রে সেই কৌশল প্রয়োগ করা যাচ্ছে না।
এই পরিস্থিতির কারণে বাংলাদেশসহ কাতারের ওপর জ্বালানি সরবরাহের জন্য নির্ভরশীল দেশগুলোর জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদী চুক্তির আওতায় থাকা এলএনজি সরবরাহ নিয়মিত না হওয়ায় সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। কাতারএনার্জি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালিতে এলএনজি পরিবহন ব্যবস্থা পুনরায় স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত এই পরিস্থিতি বজায় থাকতে পারে।
বর্তমানে বিশ্ববাজারে এলএনজির অন্যতম প্রধান সরবরাহকারী দেশ হিসেবে কাতারের এই রপ্তানি সংকট আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারেও প্রভাব ফেলছে। বাংলাদেশ সরকার এবং সংশ্লিষ্ট জ্বালানি বিভাগ এই পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে বলে জানা গেছে। তবে সরবরাহ বাতিলের এই নতুন সময়সীমা বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের ওপর কী ধরনের প্রভাব ফেলবে, তা নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে উদ্বেগ বাড়ছে।
কাতারএনার্জির পক্ষ থেকে পরবর্তী নির্দেশ না আসা পর্যন্ত এই ফোর্স মেজর কার্যকর থাকবে বলে জানানো হয়েছে।
